ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল ২০২৬ ৮ বৈশাখ ১৪৩৩
‘সীমানা পেরিয়ে’ চলে গেলেন জয়শ্রী
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Monday, 2 February, 2026, 10:46 AM

‘সীমানা পেরিয়ে’ চলে গেলেন জয়শ্রী

‘সীমানা পেরিয়ে’ চলে গেলেন জয়শ্রী

জয়শ্রী রায়কে প্রথম দেখি কলকাতার বাবুরাম ঘোষ স্ট্রিটের ‘টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে, চলছিল ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার মৌনতার সুতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর’ গানটির রেকর্ডিং। আমি স্বভাবতই বেশ নার্ভাস ছিলাম, দেশের বাইরে অমন প্রথিতযশা সুরকার এবং গীতিকারের সঙ্গে প্রথম চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠদান চাট্টিখানি কথা নয়! তাছাড়া আমি তখন সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজের প্রথম বর্ষে পা রেখেছি। রেকর্ডিং স্টুডিওর ছোট্ট সিঙ্গারবুথের গ্লাসের বাইরে তাকিয়ে তাকে ঢুকতে দেখলাম- অনিন্দ্য সুন্দরী এক অপ্সরা, পরনে সাদা রঙের একটা টপ আর লংস্কার্ট, তখনও তার পরিচয় জানা হয়নি।

সালটা ছিল ১৯৭৫, নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। সে সময় গান রেকর্ড করা হতো লাইভ অর্কেস্ট্রার সঙ্গে, অর্থাৎ সব মিউজিশিয়ানের উপস্থিতিতে লাইভ বাদন এবং যারা ক্যায়ার সিঙ্গার তাদেরও ওই একই সময়ে ভয়েস দিতে হতো! স্টুডিওভর্তি বাদ্যযন্ত্রী আর কলাকুশলী, আমার সৌভাগ্য কালজয়ী এই গানের সঙ্গে তবলা সঙ্গত করেছিলেন প্রখ্যাত তবলাবাদক রাধাকান্ত নন্দী। আমি গাইছি আর গ্লাসের বাইরে বসে থাকা গীতিকার শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ভুপেন হাজারিকা আর ছবির পরিচালক আলমগীর কবিরের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করছি- একসময় গানের মধ্যে ডুবে গেলাম, চোখ বন্ধ করে পুরো গানটা একবারে গেয়ে ফেললাম- নির্ভুল! রেকর্ডিং শেষে সিঙ্গার বুথ থেকে বেরিয়ে এলাম, সবার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা বুঝিয়ে দিল গানটা ভালো গেয়েছি! কাছে এসে সস্নেহে মাথায় হাত রাখলেন ড. ভুপেন হাজারিকা, হাতে থাকা গাঁদাফুলের মালা পরিয়ে দিলেন আমার গলায়। আলমগীর কবির সেই অনিন্দ্য সুন্দরীর হাত ধরে এগিয়ে এসে বললেন- ইনি জয়শ্রী রায়, আমার ছবি ‘সীমানা পেরিয়ে’র নায়িকা, হেসে হাত বাড়ালেন জয়শ্রী, আমিও হাত বাড়ালাম- ‘অনেক ভালো গেয়েছ।’ আর ঠিক তখনই খেয়াল করলাম হাসলে তার গালে টোল পড়ে!

গান রেকর্ডিং উপলক্ষে আমরা ছিলাম কলকাতার সদর স্ট্রিটের লিটন হোটেলে, সঙ্গে অভিভাবক ছিলেন বড়বোন রেবেকা সুলতানা এবং ভগ্নীপতি মো. সফিউল্লাহ। পরদিনই ঢাকা ফেরার কথা থাকলেও ফেরা হলো না, ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫-এ বাংলাদেশে ঘটে যায় সিপাহি-জনতার বিপ্লব। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা-কলকাতার সব ফ্লাইট স্থগিত হয়ে যায়, ফলে কলকাতায় দিনকয়েক বেশি থাকতে হয়। এ সময় প্রায় প্রতিদিন বিকালে স্থানীয় একটা ক্যাফেতে আমরা চায়ের আড্ডা দিয়েছি। আলমগীর কবিরের সঙ্গে সেই আড্ডায় জয়শ্রী আসতেন প্রতিদিন, দারুণ গল্প আর আড্ডায় কেটে যেত সন্ধ্যা আর এখান থেকেই আমার সঙ্গে বেশ সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল তৎকালীন মিস ক্যালকাটা জয়শ্রী রায়ের, সেই থেকেই তিনি আমার কাছে জয়শ্রী দিদি। এ সময় একদিন বিকালের আড্ডায় ভুপেনদাও এলেন, আমি আগেই কিছুটা অনুমান করতে পারলেও সেদিন ভুপেনদার কাছেই জানতে পারলাম পরিচালক আলমগীর কবির ও জয়শ্রী রায় একে অপরকে ভালোবাসেন এবং খুব শিগগিরই তারা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হবেন। এখনকার সময়ের মতো স্মার্টফোনের যুগ হলে কত সেল্ফিই না স্মৃতি হিসেবে তুলে রাখা যেত!

আমরা ঢাকা ফিরে আসার সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা, একদিন সকালে হঠাৎ করেই নয়াপল্টনের আমার বাবার বাড়িতে জয়শ্রীকে সঙ্গে নিয়ে আলমগীর কবির এলেন, আমি তাকে জয়শ্রীদি বলে সম্বোধন করায় আলমগীর কবির হালকা হেসে বলেন, ‘দিদি নয়, ও এখন তোমাদের ভাবি।’ আমার মা নতুন বউয়ের জন্য দ্রুত আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন, পরিবারের সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গল্প-গুজব শেষে দুজনে বিদায় নেন। এর পরপরই জয়শ্রী রায় নামের শেষ অংশ পরিবর্তিত হয়ে স্বামী আলমগীর কবিরের টাইটেল যুক্ত হলে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘জয়শ্রী কবির’ হিসেবে। তারও মাসখানেক পর ওদের সঙ্গে দেখা ঢাকা ক্লাবে, ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছায়াছবির প্রিমিয়ার শো উপলক্ষে, সেদিন বেশ প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল ওদের, সাংবাদিক পরিবেষ্টিত হয়েছিলেন দুজনই।

‘সীমানা পেরিয়ে’ মুক্তি পায় ১৯৭৭ সালে। ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানটিতে নবাগত গায়িকা হিসেবে আমার গায়কী, নবাগত নায়িকা জয়শ্রীর নিখুঁত লিপ্সিংক ও আবেদনময়ী অভিব্যক্তি, গানের কথার নতুনত্ব এবং হৃদয়স্পর্শী শব্দ, ব্যতিক্রমধর্মী সুর, সেই সঙ্গে সিনেমার দৃশ্যের চমৎকার আবহ ও ক্যামেরার কাজ- সবকিছু মিলেমিশে শ্রোতা-দর্শকের হৃদয় তোলপাড় করে একটা চিরস্থায়ী জায়গা তৈরি করে নেয়। এটি আমার সিগনেচার সং, জীবনের শ্রেষ্ঠ গান! বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের লাখ কোটি মানুষের মনে এ গান স্থান করে নিলেও শুধু প্রাপ্য সম্মানটুকু পায়নি বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র বোর্ডের কাছে। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় ১৯৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্র মোট ৪টি শাখায় পুরস্কার অর্জন করলেও ড. ভুপেন হাজারিকা সুরারোপিত এই গান জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেনি!

সে যাহোক, ১৯৭৯ সালে আলমগীর কবির পরিচালনা করেন ‘রূপালী সৈকতে’ নামে আরেকটি ছবি। এই ছবিতে আমাকে দিয়ে তিনি একটা রবীন্দ্রসংগীত গাইয়েছিলেন। একদিন তিনি ফোন করে আমাকে তার বাড়িতে ডাকেন। আলমগীর ভাই এবং জয়শ্রী দম্পতি তখন ঢাকার শ্যামলীতে একটি বাড়িভাড়া করে থাকতেন। ততদিনে সংগীতশিল্পী রফিকুল আলম আর আমার বাগদান হয়ে গেছে, তাই রফিকুল আলমও ছিলেন আমার সঙ্গে। শ্যামলী পৌঁছতে আমাদের কিছুটা দেরি হয়ে যায়, তখন বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায়, অপেক্ষায় থেকে আলমগীর কবির বেরিয়ে গেছেন, বাড়িতে ছিলেন শুধু জয়শ্রী। অল্প কিছু আলাপচারিতার পর তিনি আমার হাতে একটা খাম তুলে দিলেন, ‘রূপালী সৈকতে’ ছায়াছবিতে গান গাইবার সম্মানী। সেদিন তাকে বেশ অন্যরকম দেখেছিলাম, আগের সেই উচ্ছ্বাস ছিল না কণ্ঠে, কিছুটা ক্লান্ত আর বিমর্ষ দেখাচ্ছিল! জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা।

১২ জানুয়ারি, ২০২৬ স্যোশাল মিডিয়া সয়লাব হয়ে গেল তার মৃত্যু সংবাদে। জয়শ্রী কবির মানেই বাংলার মানুষের মনে স্থান করে নেওয়া ‘সীমানা পেরিয়ে’ চলচ্চিত্রের সেই অপূর্ব সুন্দরী মানবী, যিনি আজ সব দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে চলে গেলেন!


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status