ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ৪ মে ২০২৬ ২১ বৈশাখ ১৪৩৩
‘ঝুট বাপ্পি’ থেকে ‘কাউন্সিলর বাপ্পি’ হয়ে ওঠার গল্প
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 8 January, 2026, 1:40 PM

‘ঝুট বাপ্পি’ থেকে ‘কাউন্সিলর বাপ্পি’ হয়ে ওঠার গল্প

‘ঝুট বাপ্পি’ থেকে ‘কাউন্সিলর বাপ্পি’ হয়ে ওঠার গল্প

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিকে চিহ্নিত করেছে মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তিনি হাদি হত্যা মামলার তিন নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি।

দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরে থাকা এই বাপ্পির উত্থান, প্রভাব বিস্তার এবং অপরাধজগতের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক আবারও সামনে এসেছে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে।

ডিবি জানায়, হাদি হত্যাকাণ্ডে বাপ্পিসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে।

এর মধ্যে হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীসহ কয়েকজন এখনো পলাতক। তদন্তে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।

ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, শরিফ ওসমান হাদি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিতেন। এসব বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতাকর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়।

তদন্তে দেখা গেছে, হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাকে পালাতে সহায়তা করেন মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখ। এই দুজনকে দেশ ছাড়তে সহায়তা করেন বাপ্পি নিজেই।


রাজনৈতিক পরিচয়, আসামিদের স্বীকারোক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ, অস্ত্র ও গুলির ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং মোবাইল ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে বাপ্পির সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ডিবি জানায়, মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক পাঁচজন হলেন—হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখ, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, মানবপাচারকারী ফিলিপ স্নাল এবং ফয়সালের বোন জেসমিন।

এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে মোটরসাইকেলে এসে ওসমান হাদিকে গুলি করেন ফয়সাল করিম মাসুদ। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওসমান হাদির মৃত্যু হয়।

‘ঝুট বাপ্পি’ থেকে প্রভাবশালী কাউন্সিলর বাপ্পি
রূপনগর এলাকার এক স্থায়ী বাসিন্দা জমশেদ আলী জানান, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলছুটদের নিয়ে সাংবাদিক-রাজনীতিক ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী নতুন রাজনৈতিক দল প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) গঠন করেন। ওই দলে যোগ দেন বাপ্পির বাবা নজরুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি মিরপুর-পল্লবী এলাকায় ‘ঝুট মন্টু’ নামে পরিচিত ছিলেন। 

পিডিপির প্রার্থী হিসেবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তা আর হয়নি। পিডিপিতে যোগ দেওয়ার আগে মন্টু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে তিনি আবারও আওয়ামী লীগে ফেরেন। ২০০৯ সালের ২৬ মে মিরপুর ১১ নম্বরের নান্নু মার্কেটের সামনে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী জামিল গ্রুপের গুলিতে নিহত হন মন্টু।

সূত্র জানায়, জীবনের শুরুতে বাপ্পি পূরবী, রূপনগর ও শিয়ালবাড়ি এলাকায় সিএনজি ও টেম্পু স্ট্যান্ডের লাইনম্যান হিসেবে কাজ করতেন। পরে তিনি চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে যুক্ত হন। এরপর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলীর হাত ধরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বাপ্পি। রজ্জব আলীর মাধ্যমে তিনি পল্লবীর সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। ইলিয়াস মোল্লার সঙ্গে এস এম মান্নান কচি ও কাউন্সিলর নান্নুর দ্বন্দ্বকে পুঁজি করে পল্লবী এলাকায় বাপ্পির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১২ সালের জুলাইয়ে তিনি ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাপ্পির এক প্রতিবেশী জানান, মন্টু মিয়া নিহত হওয়ার পর বড় ছেলে হিসেবে বাপ্পি পুরো পরিবারের দায়িত্ব নেন। মন্টু মিয়া ১৭টি বিয়ে করেছিলেন এবং তার সন্তান ছিল ২২ জন। বাপ্পি তার ভাই-বোনদের বিভিন্নভাবে কাজের ব্যবস্থা করে দেন এবং ১৭ জন মাকে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা করে হাতখরচ দিতেন।

বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ২৬ বছর বয়সেই বাপ্পি হারুন নিট, স্নোটেক্স, ইপিলিয়ন, ইভেঞ্জ, আজমত, ম্যাক্স-২০০০, শরৎ, আলানা, পূরবী অ্যাপারেলস, ডেকো ইন্টারন্যাশনাল, ইমা ক্লথসহ মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার অর্ধশতাধিক গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়ের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন। পরবর্তী প্রায় ১৫ বছর ধরে এই অঞ্চলের গার্মেন্টস ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, নামমাত্র মূল্যে প্রতি মাসে ঝুট কাপড় নিয়ে যাওয়া হতো। থানা-পুলিশ বা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। উল্টো মারধরের শিকার হতে হয়েছে। বিনা টাকায় ঝুট কাপড় দিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে অভিযোগ করা হবে না—এ মর্মে লিখিত দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে ঘটনার নিষ্পত্তি করতে হয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর ভাষ্যমতে, বাপ্পির নিয়ন্ত্রিত গার্মেন্টসগুলোতে মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার ঝুট কাপড়ের ব্যবসা হতো, যার বড় একটি অংশ বিভিন্ন জায়গায় ভাগ দিতে হতো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি একসময় এলাকায় ‘ঝুট বাপ্পি’ নামে পরিচিত ছিলেন। গার্মেন্টস শিল্পের ঝুট কাপড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই তার উত্থান ঘটে। তিনি সাবেক কাউন্সিলর হাজি রজ্জব আলীকে মাদক মামলাসহ বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করে রাখেন। পরে ২০২০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন রবিনকে নাটকীয়ভাবে পরাজিত করে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বাপ্পি। ওই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রবিন আদালতে মামলা করেন এবং ভোট কারচুপির অভিযোগ তোলেন।

এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বাপ্পি। তার বিরুদ্ধে পরিবহন, গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, অটোরিকশা, জমি দখল, ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজার থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status