|
শীতই কি তবে প্রেমের ঋতু?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() শীতই কি তবে প্রেমের ঋতু? গ্রীষ্মের চনমনে ভাব ও স্বতঃস্ফূর্ততা কাটিয়ে মানুষ এ সময়টায় একটু থিতু হতে চায়। উৎসবের আলোয় প্রিয়জনের হাত ধরা কিংবা পারিবারিক আড্ডায় আত্মীয়দের 'বিয়ে করছো কবে', 'পছন্দের কেউ আছে কি না'—জাতীয় অস্বস্তিকর প্রশ্নের হাত থেকে বাঁচতে অনেকেই এ সময় সম্পর্কে জড়াতে চান। ২০০৯ সালের দিকে 'কাফিং' শব্দটি প্রথম চালু হয় বলে ধারণা করা হয়। 'কাফড' বা হাতকড়া পরার মতোই কোনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কে জড়ানোকেই এখানে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই কেবল শীত কাটানোর জন্য জেনেশুনে সঙ্গী খোঁজে? এর পেছনে কি কোনো মনোবিজ্ঞান বা বিবর্তনগত কারণ আছে? যুক্তরাষ্ট্রের স্যান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টিন মা-কেলামস বলেন, 'সঙ্গী নির্বাচনের আচরণের সঙ্গে ঋতু বদলের একটা সম্পর্ক আছে, এই ধারণাটিকেই মূলত বলা হয় কাফিং সিজন।' তবে কেন এমনটা ঘটে, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মা-কেলামস জানান, আধুনিক আচরণের দিকে তাকালে দেখা যায়, ডেটিং ওয়েবসাইট ব্যবহারের হার যে কেবল শীতে বাড়ে, এমনটা নয়; গ্রীষ্মেও এমন প্রবণতা দেখা যায়। ২০১২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে দুবার—শীত ও গ্রীষ্মে—ইন্টারনেটে প্রেম বা যৌনতা–বিষয়ক সার্চ বাড়ে। নব্বইয়ের দশকের আরেকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, জন্মহার, গর্ভপাত, যৌনরোগ এবং গর্ভনিরোধক সামগ্রী বিক্রির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শীতকালেই এসবের গ্রাফ ওপরের দিকে থাকে। তবে শীতে প্রেম বাড়ে—এ কথা পুরোপুরি বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা কঠিন হলেও এ সময় মানুষের উষ্ণতা ও সঙ্গীর আকাঙ্ক্ষা যে বাড়ে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিজ্ঞান যা-ই বলুক, ডেটিং অ্যাপগুলোর তথ্য কিন্তু বলছে ভিন্ন কথা। অ্যাপগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শরৎ ও শীতকালেই জুটি বাঁধার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে। জনপ্রিয় ডেটিং অ্যাপ 'বাম্বল'-এর তথ্যমতে, নভেম্বরের শেষ দিক থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অ্যাপে মানুষের আনাগোনা বা 'সোয়াইপ' করার হার থাকে তুঙ্গে। মজার ব্যাপার হলো, এই সময়কালটা ভালোবাসা দিবসের (ভ্যালেন্টাইনস ডে) ঠিক আগ পর্যন্ত। গবেষকদের মতে, ভালোবাসা দিবস নিয়ে মানুষের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা থাকে। এই প্রত্যাশার চাপ অনেক সময় সম্পর্ক সুন্দর করার বদলে উল্টো বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির কিনসে ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও 'দ্য ইন্টিমেট অ্যানিমেল' বইয়ের লেখক জাস্টিন গার্সিয়া বলেন, 'ছুটির দিন বা উৎসবের মৌসুমে মানুষ রোমান্স বা প্রেমের বিষয়টি নিয়ে একটু বেশিই ভাবে।' গার্সিয়া ডেটিং সাইট ম্যাচ ডটকমেরও প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা। তার মতে, 'অনলাইনে ডেটিং সারা বছরই চলে। প্রতিদিন লাখো মানুষ বার্তা আদান-প্রদান করেন। কিন্তু শীতের মাসগুলোয় এই হার চোখে পড়ার মতো বেড়ে যায়।' এর কারণ আন্দাজ করা খুব কঠিন নয়। শীতে মানুষ অনেকটা ঘরবন্দী থাকে, আবার অনেকে পারিবারিক আবহে সময় কাটান। তখন বাইরের জগতের নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে হাতের মুঠোফোনটি। মানুষও কি প্রাণীদের মতো ঋতু মেনে প্রেম করে? প্রেম বা রোমান্সের এই ঋতুচক্র বুঝতে আমরা প্রাণিজগতের দিকে তাকাতে পারি। সব প্রাণী না হলেও কিছু প্রজাতি প্রজননের জন্য নির্দিষ্ট ঋতু বেছে নেয়। বিবর্তনের ধারায় মানুষের মধ্যেও কি এমন কোনো বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন বিজ্ঞানীরা। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী ও অধ্যাপক সু কার্টার বলেন, 'গরুর মতো কিছু প্রাণীর প্রজনন ঋতুনির্ভর। কারণ, বাছুরের জন্য কচি ঘাস প্রয়োজন, তাই গরু নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চা দেয়। পাখিরাও ঋতু মেনে বংশবিস্তার করে।' কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। সু কার্টার বলেন, 'যৌন আচরণ বা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষ সুযোগসন্ধানী। আমরা ঋতু মেনে চলি না। সুযোগ থাকলে অধিকাংশ মানুষই ঘনিষ্ঠ হতে চাইবে।' জন্মহারের পরিসংখ্যানও কার্টারের এই কথা সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্রে সেপ্টেম্বর মাসে জন্মহার সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ, সন্তান ধারণের সময়টা ছিল শীতকাল। অনেকেই মনে করেন, বড়দিন বা নববর্ষের ছুটির আমেজ এর কারণ। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণার অধ্যাপক র্যান্ডি নেলসননের মতে, মানুষের এই আচরণের পেছনে জীববিজ্ঞানের চেয়ে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কারণই মুখ্য। যেমন কিছু কৃষিভিত্তিক সমাজে ফসল তোলার ৯ মাস পর জন্মহার বেড়ে যাওয়ার নজির আছে। কারণ, ফসল ঘরে তোলার পর উৎসব ও অবসরের সুযোগ থাকে। 'উইন্টার ব্লুজ' তবে নেলসন একটি জৈবিক কারণের ওপর জোর দিয়েছেন। সেটি হলো 'সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার' (স্যাড) বা শীতকালীন বিষণ্নতা। শীতপ্রধান দেশে ১ থেকে ৩ শতাংশ মানুষ এতে ভোগেন, যার মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে কম আলো ও ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে মানুষ ঘরবন্দী থাকে। এতে একাকীত্ব বাড়ে। সূর্যালোক কম পাওয়ায় শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায়। সেরোটোনিন আমাদের মেজাজ, আচরণ ও ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। অধ্যাপক নেলসন বলেন, 'শীতকালে আমরা অনেকটা গুহাবাসীর মতো হয়ে পড়ি। অন্ধকারে ঘুম থেকে ওঠা, সারা দিন কৃত্রিম আলোয় কাজ করা এবং অন্ধকারে বাড়ি ফেরা—এভাবে প্রাকৃতিক আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে আমাদের দেহঘড়ি এলোমেলো হয়ে যায়।' দেহঘড়ি ঠিকঠাক না চললে মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মতো হরমোনের মিথস্ক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে। নেলসনের মতে, এই হরমোনের ঘাটতি পূরণের জন্যই হয়তো মানুষ শীতকালে প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে চায়। মস্তিষ্ক তখন অবচেতনভাবে সংকেত দেয়, 'আমার ডোপামিন বা অক্সিটোসিন দরকার, হয়তো কোনো সঙ্গীর মাধ্যমে সেটা পাওয়া যাবে।' অক্সিটোসিনকে বলা হয় 'লাভ হরমোন' বা ভালোবাসার হরমোন। এটি আমাদের মানসিক চাপ কমায়, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং মনে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। তাই শীতে উষ্ণতা খোঁজার এই প্রবণতা কেবল আবেগ নয়, হয়তো শরীরেরও একধরনের দাবি। অধ্যাপক সু কার্টার বলেন, 'মানুষ অত্যন্ত সামাজিক জীব। আমরা যে সমাজ বা সভ্যতা গড়ে তুলেছি, তার পেছনে আমাদের শরীরবৃত্তীয় ব্যবস্থার বড় ভূমিকা আছে। অক্সিটোসিন হরমোন মানুষকে একে অপরের কাছে টানে এবং সেই বাঁধন ধরে রাখতে সাহায্য করে।' শারীরিক স্পর্শ বা আলিঙ্গনে শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়ে। কার্টারের মতে, 'শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, বিশেষ করে সম্পর্কের শুরুর দিকে বা হানিমুন পিরিয়ডে এই হরমোন খুব শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। ফলে সঙ্গীর প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব হয়।' শীতে কেন মন উষ্ণতা খোঁজে? শীতের সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রার একটি গভীর সম্পর্ক আছে। নারী ও পুরুষের শরীরে শীত অনুভূতির পার্থক্য রয়েছে। জীববিজ্ঞানের ভাষায়, সাধারণত নারীদের ত্বক ও পেশির মাঝখানে চর্বির আস্তরণ থাকে বেশি, যা ভেতরের তাপ বাইরে আসতে বাধা দেয়। আবার পুরুষদের তুলনায় নারীদের মেটাবলিজম কিছুটা ধীর। ফলে তাদের হাত-পায়ের মতো শরীরের প্রান্তভাগগুলো দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায় এবং শীত বেশি অনুভূত হয়। অধ্যাপক নেলসন বলেন, 'শীতকালে নারীদের সঙ্গী খোঁজার পেছনে অবচেতন মনে হয়তো উষ্ণতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। কেউ পাশে থেকে হাতটা ধরলে বা উষ্ণতা দিলে মন্দ কী—মস্তিষ্কের এমন ভাবনা থেকেই হয়তো কাফিং সিজনে সঙ্গী খোঁজার প্রবণতা বাড়ে।' কাফিং সিজন আমাদের সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব নতুন করে বুঝতে সাহায্য করে। জাস্টিন গার্সিয়ার মতে, সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা এ সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উৎসবের দিনগুলোয় মানুষ যখন পরিবার ও বন্ধুদের ঘেরা থাকে, তখন নিজের একাকীত্ব নিয়ে ভাবার অবকাশ পায়। সবাই যখন দম্পতি হিসেবে আসে, তখন একাকী মানুষটি ভাবেন—আগামী উৎসবে আমি কাকে বাড়িতে নিয়ে আসব? মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবারের এত সক্রিয় ভূমিকা নেই। গার্সিয়া বলেন, 'পরিবার থেকে সরাসরি চাপ না দিলেও আত্মীয়স্বজনের মাঝে থাকলে সঙ্গী নির্বাচনের সুপ্ত বাসনা বা সমাজ কী প্রত্যাশা করছে, সেই ভাবনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এটি কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।' তবে এখনকার তরুণদের মধ্যে নতুন একটি ভাবনাও লক্ষ করছেন গার্সিয়া। তার মতে, সম্পর্কে জড়ানোর আগে তরুণেরা এখন নিজেকে মানসিক ও আর্থিকভাবে গুছিয়ে নেওয়ার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। নিজেকে প্রস্তুত না করে কেবল হুজুগে বা চাপে পড়ে প্রেমে জড়াতে তাঁরা নারাজ। সব মিলিয়ে 'কাফিং সিজন'-এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের প্রেম বা সঙ্গী নির্বাচনের আচরণ ঋতুচক্রে বাঁধা নয়। তাই একে যতটা না জৈবিক বলা যায়, তার চেয়ে বেশি এটি সামাজিক বা সাংস্কৃতিক হুজুগ। বর্তমান প্রজন্মের (জেন–জি ও মিলেনিয়াল) কাছে সম্পর্কের সংজ্ঞা পাল্টাচ্ছে। একসময় ডেটিং অ্যাপে সঙ্গী খোঁজার যে উত্তেজনা ছিল, তাতে এখন ভাটা পড়েছে। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে প্রকাশিত ফোর্বসের এক জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৭৮ শতাংশ ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারী এখন 'ডেটিং বার্নআউট' বা ক্লান্তিতে ভুগছেন। শত শত প্রোফাইল ঘেঁটে সঙ্গী নির্বাচনের সেই আগ্রহ এখন আর আগের মতো নেই। জাস্টিন গার্সিয়ার মতে, ডেটিং সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আসছে। তিনি বলেন, 'সমস্যা হলো, এখনকার তরুণরা নিজেকে আগে পরিপূর্ণ করার ওপর অতিরিক্ত জোর দিচ্ছেন। তারা ভাবেন, নিজেকে পুরোপুরি প্রস্তুত না করে সম্পর্কে জড়ানো ঠিক হবে না।' কিন্তু মানুষ তো সামাজিক জীব। গার্সিয়া মনে করিয়ে দেন, 'সম্পর্কের ভেতরে থাকলেই কেবল মানুষ পরিণত হয়। ভুল করতে করতেই মানুষ শেখে যে সে আসলে কী চায়। সম্পর্ক হলো সেই বাহন, যা মানুষকে পূর্ণতা দেয়।' তাহলে এখন উপায়? শীতের দোহাই দিয়ে আপনি কি আবার ডেটিং অ্যাপে সোয়াইপ করা শুরু করবেন? সিদ্ধান্ত আপনার। তবে কাফিং সিজনের এই হুজুগে গা না ভাসিয়ে সম্পর্কের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত গতির ওপর ভরসা রাখাই হয়তো বুদ্ধিমানের কাজ। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
