দশকের পর দশ ধরে সংঘাত সয়ে আসছে পাক-আফগান সীমান্তবর্তী জনপদ। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে চিত্রায়িত করতে গেলে প্রথমদিকেই চলে আসে এই অঞ্চল। তবে সম্প্রতি আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার পর সেখানে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এরপরই প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান কি পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধে জড়াচ্ছে?
আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার যেনো পাকিস্তানে কোনো ধরণের সন্ত্রাসী হামলা না হয় সেজন্য গত দুই বছর ধরে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তালেবান সরকারের কাছে ক্রমাগতভাবে দাবি জানানো হচ্ছিলো। পাকিস্তানি সশস্ত্র গ্রুপ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবানের বন্ধুপ্রতিম সংগঠন। কাবুলে তালেবানের ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটি টিটিপির নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে সীমান্ত পার হয়ে মাঝেমধ্যেই পাকিস্তানের সামরিক এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় তারা।
ইসলামাবাদ চায়, আফগান তালেবান যেনো টিটিপির লাগাম টানে। কিন্তু এই দাবির প্রতি আফগান তালেবানের যে শীতল প্রতিক্রিয়া তা ঘুরে ফিরে টিটিপিকে উৎসাহিতই করেছে।
টিটিপি পাকিস্তানে নিষিদ্ধ। তাদের মূল টার্গেট দেশটির উত্তর-পশ্চিমে আফগান সীমান্তবর্তী এলাকা।
গত শনিবার (১৬ মার্চ) বিস্ফোরকভর্তি ট্রাক নিয়ে একজন আত্মঘাতী হামলাকারী উত্তর ওয়াজিরিস্তান জেলায় একটি সামরিক চেকপয়েন্টে বিস্ফোরণ ঘটায়; এতে সাত সেনা নিহত হন। জইশ-ই-ফুরসান-ই-মুহাম্মদ গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। যদিও পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, সংগঠনটি টিটিপি সদস্যদের নিয়ে গঠিত।
প্রতিশোধ হিসেবে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান; যা কাবুলের ইসলামপন্থী শাসকদের ক্ষুব্ধ করেছে।
পাকিস্তান বলেছে, তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল পাকিস্তানি তালেবানের একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী। এই হামলাকে 'আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে সীমান্ত অঞ্চলে গোয়েন্দাভিত্তিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান' বলে বর্ণনা করেছে তারা।
তবে তালেবান সরকারের দাবি, ইসলামাবাদ বেসামরিক বাড়িঘর টার্গেট করেছে এবং ওই হামলায় তিন শিশুসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন।
গত কয়েক বছর ধরেই আফগান তালেবান এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে এবং টিটিপি নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
'ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে' পাকিস্তানের
‘পাকিস্তানের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হল- আমরা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, বিশেষ করে টিটিপি এবং এর সহযোগীদের থেকে নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন; আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে যাদের আস্তানা এবং নিরাপদ স্বর্গ রয়েছে।’ জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলেকে (ডিডব্লিউ) বলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুমতাজ জাহরা বালোচ।
‘এই সংগঠনগুলো এতটা স্বাধীনভাবে আফগানিস্তানে থেকে অবাধে কাজ করে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় তাতে আমরা উদ্বিগ্ন।’
তিনি জানান, পাকিস্তান বারবার তালেবান সরকারকে টিটিপি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে এবং আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছে।
কিন্তু আফগানিস্তানের তালেবান নেতৃত্ব পাকিস্তানের দাবিকে বারবার উপেক্ষা করছে। তাদের যুক্তি হল- ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের জঙ্গিদের দৃশ্যপট বুঝতে ভুল করে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান শক্তি প্রয়োগ করলে শুধু আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানই নয়, সমগ্র অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।
কিন্তু পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আফগান সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমশ অস্বস্তি বাড়ছে।
পাকিস্তানের একজন প্রাক্তন কূটনীতিক এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশ্লেষক মালিহা লোধি ডিডব্লিউকে বলেন, ‘পাকিস্তানের বিমান হামলা টিটিপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কাবুলের ব্যর্থতায় ইসলামাবাদে গভীর এবং ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলন। গত দুই বছরে বহু দফা আলোচনা হলেও তালেবান কর্তৃপক্ষের বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।’
তালেবান নেতারা [আফগানিস্তানে] টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পাকিস্তানের কাছে বার বার সময় চেয়েছে। কিন্তু ইসলামাবাদ এখন এটিকে শুধুই অজুহাত হিসাবে দেখছে এবং তাদের ধৈর্য ফুরিয়ে গেছে। যোগ করেন তিনি।
টিটিপি কী চায়?
টিটিপির প্রাথমিক দাবিগুলির মধ্যে একটি ছিল- দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান সরকার এবং সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি কমাতে হবে। এই অঞ্চলের যেখানেই সরকারি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকে সেখানেই হামলা চালায় টিটিপি।
টিটিপির মধ্যে বেশ কিছু কট্টরপন্থী সুন্নি বিদ্রোহী এবং বেশ কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যারা ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি হামলা চালিয়ে আসছে। যদিও টিটিপি কাবুলে আফগান তালেবানদের সাথে সরাসরি যুক্ত নয়, তবে তারা এই গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য রাখে।
পাকিস্তান ২০০৮ সালে টিটিপিকে নিষিদ্ধ করে। পাকিস্তানজুড়ে বহু হামলার জন্য দায়ী সংগঠনটি। এরমধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হামলা ছিল- ২০১৪ সালে পেশোয়ারের একটি স্কুলে হামলা; যাতে অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়; যাদের বেশিরভাগই স্কুলছাত্রী।
টিটিপি পাকিস্তানে শরিয়া আইন চালু করা এবং তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের মতো পাকিস্তানকেও ইসলামপন্থী ‘আমিরাতে’ পরিণত করে সমগ্র অঞ্চলে তালেবান শক্তির বিস্তারের পক্ষে কথা বলে।
টিটিপিকে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
টিটিপির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ?
পাকিস্তান কয়েক বছর ধরে টিটিপির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে, তারা জঙ্গি গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
পাক সেনারা অবশ্যই আফগানিস্তানের ভেতরে টিটিপির গোপন আস্তানায় আক্রমণ শুরু করবে; যা আফগান তালেবানদের আরও ক্ষুব্ধ করবে এবং সম্ভবত এটিকে যুদ্ধ হিসেবেই দেখবে।
কাবুলে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ ডিডব্লিউকে বলেন,
পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। আফগানিস্তান কাউকে তার ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানোর অনুমতি দেয় না।
‘পাকিস্তানের তার ভূখণ্ডে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য আফগানিস্তানকে দোষারোপ করা উচিত নয়। এই ধরনের ঘটনা [পাকিস্তানের বিমান হামলা] খুব খারাপ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।’ তিনি যোগ করেন।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো এবং ফ্রান্স ও কানাডায় আফগানিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ওমর সামাদ মনে করেন, পাকিস্তান আর টিটিপির হুমকি আর উপেক্ষা করতে পারে না।
‘সমস্যার শিকড়, ইতিহাস এবং বছরের পর বছর ধরে চলা বিবর্তন নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। এর সঙ্গে আরও বেশি খেলোয়াড় এবং এজেন্ডা যুক্ত হয়েছ। এখন পুরোমাত্রায় সংঘাত এড়াতে নতুন করে চিন্তা করা দরকার। কারণ, বড় ধরণের সংঘাত কোন স্টেকহোল্ডারের জন্যই সুখকর হবে না।’ জোর দিয়ে বলেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ সমস্যা
বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, যদি পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ নাও হয় তবু আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাগুলিও যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী নির্বাচনে কথিত হস্তক্ষেপ এবং কারাবন্দী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার দলের প্রতি কঠোর আচরণের জন্য ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। অপরদিকে টিটিপি সমস্যা পাকিস্তানের জন্য বাস্তব। আফগান সীমান্তে একটি সামরিক সংঘর্ষ জনগণের মাঝে জেনারেলদের সমর্থন ফেরাতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে টিটিপি ইস্যুতে আফগান তালেবানদের মধ্য বিভক্তি আছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল ফর রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্সের প্রধান মুহাম্মদ ইসরার মাদানি ডিডব্লিউকে বলেন, আফগানিস্তানের তালেবানের নেতৃত্ব ‘টিটিপি ইস্যুটির সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করলেও মধ্য ও নিম্ন স্তরের কর্মীরা তাদের জিহাদি আদর্শের কারণে তা বুঝতে পারেন না’।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকার টিটিপির বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে অনিচ্ছুক হওয়ার একটি কারণ হল- এর ফলে তাদের নিজেদের র্যাঙ্ক ভেঙে পড়তে পারে এবং ইসলামিক স্টেটের মতো গোষ্ঠীর দিকে তাদের চালিত করতে পারে।
কাবুলভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক তামিম বাহিস বলেন, ‘সাধারণ আফগানরা পাকিস্তানকে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে উসকানিদাতা এবং সহিংসতার সমর্থক হিসাবে দেখেন।’
‘চার দশকের সংঘাত সহ্য করার পর, আফগানিস্তান অবশেষে শান্তির আভাস অর্জন করেছে। এই অবস্থায় পাকিস্তানের বিমান হামলাকে আফগানিস্তানকে জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল হিসাবে চিত্রিত করার এবং জাতিকে আবার রক্তপাতের আরেকটি চক্রের দিকে টেনে নেয়ার প্রচেষ্টা হিসাবে দেখেছে তারা।‘ ডিডব্লিউকে বলেন তিনি।
আর তালেবান নেতৃত্ব তার নিজের বৈধতার জন্য জনগণের এই অনুভূতি ব্যবহার করতে পারে।