আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো: আলমগীর। সিটি কর্পোরেশনগুলো হলো গাজীপুর, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা। গত ৫ মার্চ নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমনটি বলেন।
খুলনা ও রাজশাহী সিটির ক্ষণগননা শুরু হবে ১৩ই এপ্রিল। সেক্ষেত্রে ১০ই অক্টোবরের মধ্যে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বরিশাল সিটি ভোটের ক্ষণগননা শুরু হবে ১৪ই মে থেকে ১৩ই নভেম্বর।সিলেট সিটি ৬ই মে থেকে পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষণগননা শুরু হবে। ৬ নভেম্বরের মধ্যে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
মো. আলমগীর আরো বলেন,' গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তফসিলের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি আমাদের। যেটা আলোচনা হয়েছিল গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট এইগুলোর নির্বাচনগুলো সেগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে করতে হয়।'
ইচ্ছা করলে ৬ মাসের মধ্যে শেষ করা যায়। মাঝামাঝি করা যায় আগেও করা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, 'যেহেতু আমাদের জাতীয় নির্বাচন আছে এবছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সেজন্য আমাদের চেষ্টা থাকবে এই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন শেষের দিকে না করে প্রথম দিকে করা'।
১১ই মার্চ থেকে ১০ই সেপ্টম্বরে গাজীপুরে ভোটের সময় জানিয়ে এই কমিশনার বলেন, 'যে কোনো সময়ে নির্বাচন হতে পারে। সেই হিসেবে যেহেতু জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। সেজন্য নির্বাচনগুলো আর্লি (আগে) করার চেষ্টা করবো। মার্চের পরে যে কোনো সময় নির্বাচন হতে পারে'।
তিনি বলেন, ‘গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে কমিশন আলোচনা করেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে এসব সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন করতে হয়। ইচ্ছা করলে ৬ মাসে শেষ করা যায়। মাঝামাঝি করা যায়, আগেও করা যায়। যেহেতু জাতীয় নির্বাচন আছে এ বছরের ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে সেজন্য আমাদের চেষ্টা থাকবে এ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন শেষের দিকে না করে প্রথম দিকে করা। এজন্য সেটাই করবো।’
নির্বাচনী উত্তাপ
বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনে থাকায় এসব নির্বাচনেও প্রার্থী দেবে না বলে জানিয়েছে দলীয় সুত্র। ফলে পাঁচ মহানগরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সিটি নির্বাচন নিয়ে কোনো তৎপরতা তাদের নেই। সিটি নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে তৎপর রয়েছেন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিভিন্ন দিবসে পোস্টার, ব্যানার আর ফেস্টুনে সিটির জনগণকে সালাম-শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, দলীয় এবং সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন তারা। এ সময় অনেকেই নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করে দোয়া ও সমর্থন চাইছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন । বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও নীতিনির্ধারকদের দ্বারে দ্বারে ধরনা দিচ্ছেন । জাতীয় পার্টি এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মাঠে তৎপর রয়েছেন।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে এরই মধ্যে পাঁচটি মহানগরের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সার্বিক বিবেচনায় প্রার্থিতাও প্রায় চূড়ান্ত। তপশিল ঘোষণার পর সব রকম আনুষ্ঠানিতার মধ্য দিয়ে দলীয় ফোরামের অনুমোদন ক্রমে মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, মাঠে সম্ভাব্য অনেক প্রার্থীকে দেখা গেলেও পাঁচ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে জনপ্রিয় ও যোগ্যদেরকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। ৫ সিটির মধ্যে সিলেট ছাড়া বাকি চার সিটিতে ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা মেয়র পদে বিজয়ী হন। তবে ২০২১ সালের নভেম্বরে গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে সাময়িক বহিষ্কার করে সরকার। বিভিন্ন সুত্র ও দলীয় বিবেচনায় যারা মনোনয়ন পেতে পারেন।
সিলেটে আক্তারুজ্জামান
সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র প্রার্থী হতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাতজন নেতা মাঠে আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজন দলীয় মনোনয়ন পাবেন, এত দিন এমনটাই মনে করা হচ্ছিল।
তবে হঠাৎ করে গুঞ্জন উঠেছে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। সম্প্রতি তাঁর অনুসারীরা নগরজুড়ে এ প্রচারণা চালান। এর ফলে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী অপর প্রার্থীদের মধ্যে ‘চাপা ক্ষোভ’ দেখা গেছে।
মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আনোয়ারুজ্জামান গত দুটি সংসদ নির্বাচনের আগে সিলেট-২ (ওসমানীনগর ও বিশ্বনাথ) আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে তৎপর ছিলেন। তিনি নগরের ভোটারও নন। সম্প্রতি দেশে ফিরে মেয়র পদে নির্বাচন করতে দলীয় উচ্চপর্যায়ের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেয়েছেন বলে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাঁর এই আগমন ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’র মতো। এ নিয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্যরা ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ।
গাজীপুরে নতুন সম্ভাবনা সাইফুল
নির্বাচন কমিশন সুত্র মতে আগামী জুনেই গাজীপুর সিটিতে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে।
নির্বাচন সামনে রেখে বেশ আগ থেকেই গাজীপুর মহানগরে তৎপরতা চালাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতা। এদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী যুবলীগের গাজীপুর মহানগর যুগ্ম আহবায়ক সাইফুল ইসলাম, গত নির্বাচনে বিজয়ী এবং বহিষ্কৃত মেয়র অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমতউল্লা খান, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেল, ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল মামুন মণ্ডলসহ বেশ কয়েকজন নেতা। তপশিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের রং-বেরঙের পোস্টারে নগরীর অলিগলি ছেয়ে গেছে ।
দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক জন মনোনয়ন দৌড়ে থাকলেও যুবলীগ নেতা সাইফুল সাধারন ভোটার ও দলীয় নেতা কর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় , দলের নীতি নির্ধারকরা তাঁকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে রেখেছেন বলে সুত্র জানায়। অপরদিকে বিতর্কিত সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরও চেষ্টা করছেন দলীয় মনোনয়ন পেতে, তবে তাঁর অতীত অবস্থান বিবেচনায় নিচ্ছে দল, সেক্ষেত্রে তিনি মনোনয়ন নাও পেতে পারেন।আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লাহ খান প্রবীন নেতা হলেও নেতা কর্মীদের মাঝে তার গ্রহনযোগ্যতা নেই বলে জানিয়েছে দলীয় সুত্র।
রাজশাহীতে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন
সিটি নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহীতেও তৎপর রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা। আলোচনায় আছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ।
বর্তমান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। তার আগ্রহ জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া। এ কারণে তিনি ঘনিষ্ঠজনদের কাছে সিটি মেয়রের পরিবর্তে আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। সেক্ষেত্রে বড় মেয়ে ডা. আনিকা ফারিহা জামান অর্ণাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান তিনি। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে ভিন্ন কোনো চিন্তা না করে দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে খায়রুজ্জামান লিটনকেই আরেকবার রাজশাহীর মেয়র প্রার্থী করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
খুলনায় তালুকদার খালেক
খুলনায় মেয়র হিসেবে তালুকদার আব্দুল খালেকের কোনো বিকল্প ভাবছে না শীর্ষ নেতৃত্ব। কেন্দ্রের সংকেতে প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যেই তিনি নির্বাচনী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার পক্ষে মাঠ নেতাকর্মীরাও একাট্টা। এর বাইরে অন্য কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশীর প্রকাশ্য তৎপরতা নেই।
বরিশালে আবার সাদিক আবদুল্লাহ
এখানে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য বর্তমান মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ আবারও মনোনয়ন পাচ্ছেন। কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যেই এ বিষয়ে সেই সিগন্যাল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সেখানে তার বিকল্প হিসেবে মেয়র পদে কারও প্রকাশ্য তৎপরতাও নেই।