বৃহস্পতিবার থেকে যাত্রী পরিবহন শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষার মেট্রোরেলে। এমআরটি-৬ লাইনের দিয়াবাড়ী-আগারগাঁও অংশে টিকিট কেটে চড়বেন যাত্রীরা। এ অংশের ভাড়া ৬০ টাকা। এই ভাড়া বেশি, না যৌক্তিক- তা নিয়ে রয়েছে মতভেদ।
সরকারি কর্তৃপক্ষের যুক্তি- শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মেট্রোরেল যানজটের কবল থেকে যে মূল্যবান সময় বাঁচাবে, সে তুলনায় ভাড়া বেশি নয়। তবে সমালোচকরা বলছেন, যাত্রীদের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করা হয়নি। উচ্চ ভাড়ার কারণে নিম্নবিত্তের যাত্রীরা বাস ছেড়ে মেট্রোরেলমুখী হবেন না। তাহলে মেট্রোরেল নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
এমআরটি-৬ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (পূর্ত) আবদুল বাকি মিয়া সমকালকে বলেছেন, যানজটের মূল কারণ প্রাইভেটকার। মেট্রোরেল তা কমাবে। মেট্রোরেলে দিয়াবাড়ী-কমলাপুরের দূরত্ব ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। যানজটে ঢাকায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার। প্রাইভেটকারে দিয়াবাড়ী-কমলাপুর রুটে চার ঘণ্টা সময় লাগবে; মেট্রোরেলে ৪০ মিনিট। প্রাইভেটকারে ৪০০ টাকার জ্বালানি লাগবে; মেট্রোতে ভাড়া ১০০ টাকা। এ হিসাবে মেট্রো অনেক সাশ্রয়ী।
বাসের তুলনায় মেট্রোরেলের ভাড়া দ্বিগুণ। বাসের ভাড়া কিলোমিটারে দুই টাকা ৪৫ পয়সা; মেট্রোতে ৫ টাকা। বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা; মেট্রোতে ২০ টাকা। পল্লবী থেকে আগারগাঁওয়ে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ৩০ টাকা। এ পথে বাসের ভাড়া ১০ টাকা। বাসে শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়ায় যাতায়াত করতে পারে। মেট্রোরেলে এই সুবিধা নেই।
গত ৮ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞপ্তিতে ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। তাতে শিশুদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। সে সময় মেট্রোরেলের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ডিএমটিসিএল জানিয়েছিল, শিশু-বয়স্ক সবাইকে ভাড়া দিতে হবে। তবে গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক জানান, ৩ ফুট বা ৯০ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুদের ভাড়া লাগবে না। তারা অভিভাবকের সঙ্গে যাতায়াত করতে পারবে। কোনো শিশু একা মেট্রোরেলে চড়তে পারবে না।
এমআরটি-৬ এর প্রথম তিনটি স্টেশন উত্তরা নর্থ, উত্তরা সেন্টার এবং উত্তরা সাউথের আশপাশে জনবসতি খুব একটা নেই। পল্লবী স্টেশন থেকে শুরু হয়েছে জনবহুল এলাকা। এই স্টেশন থেকে মিরপুর-১১, মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়ার ভাড়া ২০ টাকা। শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁওয়ের ভাড়া ৩০ টাকা। মিরপুর ১১ নম্বর থেকে উত্তরা নর্থ ও আগারগাঁওয়ের ভাড়া ৩০ টাকা। মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, উত্তরা সাউথ ও সেন্টারের ভাড়া ২০ টাকা। মিরপুর-১০ থেকে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁওয়ের ভাড়া ২০ টাকা। দিয়াবাড়ীর ভাড়া ৪০ টাকা।
আগামী বছরের ডিসেম্বরে এমআরটি-৬ এর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ চালু হবে। ২০২৫ সালে চালু হবে কমলাপুর পর্যন্ত। দিয়াবাড়ী থেকে মতিঝিল ও কমলাপুর ১০০ টাকা; টিএসসি ও সচিবালয় ৯০ টাকা; কারওয়ান বাজার ও শাহবাগ ৮০ টাকা, ফার্মগেট ৭০ টাকা। পল্লবী থেকে বিজয় সরণি ৪০ টাকা, ফার্মগেট ৫০ টাকা। মিরপুর-১১ থেকে ফার্মগেট ৪০ টাকা। মিরপুর-১০ থেকে ফার্মগেট ৩০ টাকা।
ঢাকার মেট্রোতে ভাড়া ২০ থেকে ১০০ টাকা হলেও দিল্লিতে তা ১০ থেকে ৬০ রুপি। সেখানে ২১ কিলোমিটার পর্যন্ত ভাড়া ৪০ রুপি। ঢাকার সঙ্গে তুলনা করলে দিল্লিতে ভাড়া সাড়ে ১২ থেকে ৫০ টাকা। কলকাতায় সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ রুপি বা ৬ টাকা। সর্বোচ্চ ভাড়া ২৫ রুপি বা ৩০ টাকা। অন্য দেশের তুলনায় ভাড়া বেশি কিনা- প্রশ্নে এমএএন ছিদ্দিক বলেন, সেসব দেশে আরও আগে মেট্রো নির্মিত হওয়ায় নির্মাণ ব্যয় ছিল কম। বাংলাদেশের নির্মাণ ব্যয়ের হিসাবে ভাড়া তার চেয়ে কম রাখা হচ্ছে।
যাত্রী আকৃষ্ট করতে ভাড়া ৩০ শতাংশ কমানোর পরামর্শ দিয়েছে নীতি বিশ্নেষণী প্রতিষ্ঠান আইপিডি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভাড়া সাধারণের নাগালের মধ্যে না থাকলে তাঁরা মেট্রোতে চড়বেন না। এখন যেসব যাবাহনে চড়েন, তাতেই চলবেন। ফলে যানজট কমবে না। মেট্রো নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া মওকুফের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
মেট্রোরেলের ভাড়াকে উচ্চ বলছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ভাড়া ৫০ শতাংশ কমানো উচিত। ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে দুই গুণ-তিন গুণ খরচে ঢাকায় মেট্রোরেল তৈরি করা হচ্ছে। এর খেসারত যাত্রীদের দিতে হচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকায় মেট্রোর সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।
মেট্রোতে স্মার্টকার্ডে ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে। বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করতে পারবেন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধারা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা (শারীরিক প্রতিবন্ধী) ১৫ শতাংশ ছাড় পাবেন। সাপ্তাহিক ও মাসিক ভাড়ায় কতটা ছাড় দেওয়া হবে- তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
মেট্রোপাস বা স্টেশনে স্বয়ংক্রিয় বুথে টাকা ঢুকিয়ে সিঙ্গেল জার্নি টিকিট কিনে ট্রেনে চড়া যাবে। পাস পেতে করতে হবে নিবন্ধন। ১০ বছরের পাসের জন্য লাগবে ২০০ টাকা জামানত। পাস বা টিকিট পাঞ্চ করে ঢুকতে হবে স্টেশনের পেইড জোনে। যাত্রা শেষে পাঞ্চ করে বের হতে হবে স্টেশন থেকে। অতিরিক্ত ভ্রমণ করলে টিকিটের দামের ১০ গুণ জরিমানা গুনতে হবে।
ভাড়ার আয়ে মেট্রোরেলের নির্মাণ ও পরিচালনার খরচ উঠবে না। এমএএন ছিদ্দিক জানান, সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। আয় বাড়াতে স্টেশন এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাবে ডিএমটিসিএল।