উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি পাঁচখোলা খাল। কিন্তু মাদানী এভিনিউ থেকে বালু নদ পর্যন্ত ১০০ ফুট সড়কের তৃতীয় ব্রিজের পাশে এসে থমকে গেছে খালটির সোজা গতিপথ। কারণ, পানি বয়ে যাওয়ার সোজা গতিপথ ভরাট করে পূর্বদিকে প্রায় ১০০ মিটার বাঁকিয়ে খালটির ওপর ব্রিজ নির্মাণ করার পর এখন আবার প্রশস্ত করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
পাঁচখোলা খালের সোজা পথ ভরাট করে গতিপথ ডান দিকে ঘুরিয়ে ফের আনা হয়েছে বামে। রাজউকের এই কাণ্ডে বর্তমানে ওই স্থানে ব্রিজ নির্মাণের পর প্রশস্ত করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকের ফসলি জমি।
স্থানীয়দের দাবি, খালের সোজা গতিপথ সচল রেখে তার ওপর ব্রিজ নির্মাণ করলে রক্ষা পেত এসব ফসলি জমি। আর ক্ষতির মুখে পড়তেন না জমির মালিক ও কৃষকরা। খালটির ভরাট করা সোজা গতিপথ সচল করে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, সোজা গতিপথের ওপরই যেন ব্রিজ নির্মাণ করা হয়।
পাঁচখোলা খালটির একপাশে বেরাইদ, অন্য পাশে সাঁতারকূল। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা মাদানী সড়কে খালটির সোজা গতিপথ আসতেই তা ভরাট করে প্রায় ১০০ মিটার বাঁকিয়ে ডানে পূর্ব পাশে নেওয়া হয়েছে। পরে খালটির গতিপথ আবারও ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে বামে মাদানী সড়কের উত্তর পাশে খালটির সোজা গতিপথ বরাবর। খালটির সোজা গতিপথ পাল্টে পূর্বদিকে নিয়ে সেখানে ব্রিজ নির্মাণের পর এবার শুরু হয়েছে প্রশস্তকরণের কাজ।
রাজউক সূত্র জানায়, ২০১০ সালে প্রগতি সরণি থেকে বালু নদ পর্যন্ত ৬.৭১ কিলোমিটার ইন্টারসেকশন সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২৩১ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে প্রকল্পটি সমপ্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সমপ্রসারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী মাদানী এভিনিউ থেকে বালু নদ পর্যন্ত সড়ক ও ব্রিজগুলো প্রশস্তকরণ এবং বালু নদ থেকে শীতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ (প্রথম পর্ব) প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ২৫৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদানী সড়কের এক নম্বর ও দুই নম্বর ব্রিজ প্রবাহিত খালের সোজা পথের ওপর নির্মাণ করা হলেও তিন নম্বর ব্রিজ হচ্ছে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ঘুরিয়ে বাঁকা পথের ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঁচখোলা খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণের কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে খালটির সোজা পথ ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক।
খালটির সোজা গতিপথ বাঁকিয়ে প্রায় ১০০ মিটার পূর্বে ব্রিজ নির্মাণ করে এখন প্রশস্ত করতে গিয়ে খনন করা হচ্ছে দুই পাশের জমি। সোজা গতিপথ ভরাটের কারণে খালের দক্ষিণ অংশে পানি থাকলেও উত্তর অংশে নেই। ফলে খালটির এক পাশ শুকিয়ে গেছে।
ব্রিজ নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১০০ ফুট রাস্তা নির্মাণে ব্রিজ সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে ব্রিজটি ৬০ ফুট প্রশস্ত। আরো ৪০ ফুট প্রশস্ত করতে হবে। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ব্রিজটি ২০ ফুট করে সম্প্রসারণ করা হবে। বিদ্যমান ব্রিজটির দুই পাশে আরো দুটি ব্রিজ সংযুক্ত করা হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিন নম্বর ব্রিজের দুই পাশে প্রশস্তকরণ কাজ চলছে। ব্রিজটির উত্তর পাশে জমি কেটে নতুন ব্রিজ তৈরির জন্য চলছে পিলার স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ। আর দক্ষিণ পাশেও একইভাবে চলছে মাটি কাটা।
স্থানীয়রা বলছেন, খালের গতিপথ ঘুরিয়ে অবৈধভাবে ব্যক্তি মালিকানার ফসলি জমি নষ্ট করে তৈরি করা হচ্ছে এই ব্রিজ। প্রতিকার পেতে সংশ্লিষ্ট মহলে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সিটি জরিপ অনুযায়ী ৯০৮, ৯০৯ ও ৯২৪ নম্বর দাগ তাঁদের পূর্বপুরুষের জায়গা। যুগ যুগ ধরে এসব জমি চাষাবাদ করে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাঁচখোলা খালসংলগ্ন জমি হওয়ায় প্রতি বছর দুই মৌসুম ধান আবাদ হতো। প্রচুর পরিমাণ সবজি উৎপাদন হতো। কিন্তু রাজউকের সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পাশে পড়ায় হঠাৎ এসব ফসলি জমিতে গর্ত বানিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে রাজউকের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ রাজউক চেয়ারম্যানকে এক চিঠিতে পাঁচখোলা খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যৌথ উদ্যোগে সরেজমিন সার্ভে সম্পন্ন হলেও সে বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আর চলতি বছরের গত ২০ ফেব্রুয়ারি আরো একটি চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু তার পরও ব্যক্তি মালিকানার জমিতেই চলছে ব্রিজ নির্মাণকাজ। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ।
২০১৬ সালে চিঠি পাঠানোর পর কেটে গেছে চার বছর। কিন্তু কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর ন্যায্য দাবি-দাওয়া ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের তাগিদপূর্ণ নির্দেশনা আমলে নেয়নি রাজউক। উল্টো তিন নম্বর ব্রিজটির সমপ্রসারণ কাজও শুরু হয় ফসলি জমির ওপর।