ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ২৬ জুন ২০২৬ ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
শুদ্ধি অভিযানে মুক্তি পাক আমার শিশু ভাই
সাকিব আল রোমান
প্রকাশ: Tuesday, 1 October, 2019, 2:02 AM

শুদ্ধি অভিযানে মুক্তি পাক আমার শিশু ভাই

শুদ্ধি অভিযানে মুক্তি পাক আমার শিশু ভাই

বাংলাদেশ প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ, অতএব ৬ কোটিরও বেশি শিশু। অথচ, শিশুর সুরক্ষা আইন এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। শিশুদের জন্য যেসব সেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেগুলোতে মান ও সমতার ঘাটতি রয়ে গেছে। শিশুর সুরক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা সেগুলোতেও পর্যাপ্ত লোকবল ও অর্থ বরাদ্দ হয় না।

যে বয়সে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল বই আর পেন্সিল কিন্তু তার পরিবর্তে শিশুটি নিজের আহার জোগানোর জন্য কাজের সন্ধানে নামতে বাধ্য হচ্ছে। এক শ্রেণীর লোভী স্বার্থ পিপাসু মানুষ এই সকল শিশুর দারিদ্রের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ওদের দ্বারা কাজ করায়। কেননা এ সকল শিশুদের শ্রমের মূল্য খুবই নগন্য। বাংলাদেশে যে সকল সেক্টরে শিশু শ্রমের প্রবনতা বেশি তার মধ্যে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস, প্রিন্ট এবং এমব্রয়ডারি, পোশাক, চামড়া শিল্প, জুতা এবং ইট কারখানা অন্যতম। এখনো বয়ষ গোপন করে অনেক শিশু গার্মেন্টসে কাজ করছে। মার্কিন শ্রম বিভাগের প্রতিবেদন অনুসারে শিশু শ্রম ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে ভারত এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে ফিলিপাইন।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের সংবিধানে অনুযায়ী আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী সকল বাংলাদেশী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে এবং চৌদ্দ (১৪) থেকে আঠারো (১৮) বছরের কম বয়সী শিশুদেরকে কিশোর/কিশোরী হিসেবে গন্য করা হয়। স্কুল চলাকালীন সময় চৌদ্দ (১৪) বছরের নিচে কোন শিশুকে তার পরিবারের লিখিত অনুমতি ছাড়া উৎপাদনশীল কাজে নিয়োগ দেয়া বা কাজ করিয়ে নেয়াকে শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে আমাদের দেশে এখনো সবাই উন্নয়নশীলতার ছোঁয়া না পাওয়ায় এই নিয়মের শতভাগ মানার মত অবস্থায় তারা নেই। বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক দুরবস্থা হচ্ছে শিশু শ্রমের প্রথম ও প্রধান কারণ। লেখাপড়ার খরচ দিতে না পেরে এবং সংসারের অসচ্ছলতার গ্লানি একজন মা-বাবাকে বাধ্য করে তার সন্তানকে শ্রমে নিযুক্ত করতে। সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, শিশু শ্রম, বাল্যবিয়ে এবং মানসিকভাবে হয়রানি এখনও অহরহই ঘটছে। শিশুর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য একটি বড় ভূমিকা রাখে।

রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সবার দায়িত্ব শিশুদের অধিকার রক্ষা করা। দেশের কয়েক লাখ শিশু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে শিশুদের নির্যাতনের খবর আমরা পাই। কর্মক্ষেত্রে শিশুরা শিকার হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের। যৌন হয়রানির প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন আছে। তবে তা যৌন হয়রানির ঘটনাকে আমলে নেয় না। খুব ছোট শিশুদের বিপজ্জনক কাজে লাগানো হচ্ছে। ১৭ লাখ শিশু, যাদের বেশিরভাগই ছেলে, তারা শিশু শ্রম দিচ্ছে। অনেক মেয়েই ঘরকন্নার কাজে জড়িত থাকে। কিশোরী মেয়েরা অনেক সময়ই ঘরে সহিংসতার পাশাপাশি যৌন হয়রানির শিকার হয়। তারা এক ধরনের গৃহ দাসত্বের কবলে পড়ে। বলাই বাহুল্য, এরা শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত!

পোশাকশিল্পের ছোট কারখানা ছাড়াও অনেকে ট্যানারি, চামড়া, জুতা, যানবাহন, ভিক্ষাবৃত্তিসহ বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে। এদের কর্মক্ষেত্র ও কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কাজে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু মালিক আছেন, যাঁরা কম পয়সায় বেশি মুনাফা করতে চান। এঁরা বেশি বেতন দেওয়ার ভয়ে বড়দের কাজে লাগান না। শিশুদের দিয়ে কাজ করান। এসব মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

‘শিশু শ্রম নয়, শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়’ এই স্লোগানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশেও পালিত হবে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। বাণী দেন প্রধানমন্ত্রী। আমরা বাণী শুনি বা শুনি, মানি বা না মানি তবে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আইএলও ঢাকা অফিস, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ ও বিশেষ প্রকাশনা প্রকাশ, আলোচনা অনুষ্ঠান, পোস্টার, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করি। এতে কোন শিশুর উপকার হয়েছে কি? শুধুমাত্র নিজেরা সেলফি তুলে অথবা ফটোসেশন করে পরবর্তীদিনের খবরের শিরোনাম হওয়ার চেষ্টা করি। অথচ, যে টাকা খরচ করে গণমাধ্যমে ক্রোড়পত্র ছাপা হয় বা লিফলেট বিতরণ করা হয় তা দিয়ে কয়েকটি পরিবারের শিশুকে দরিদ্রতার কবল থেকে মুক্ত করা যায়।

যে শিশুদের প্রাইমারি স্কুলে পড়ার বয়স হয়েছে, তাদের অনেকেই উচ্চ মানের শিক্ষা এবং সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্কুলে কিশোরী ও প্রতিবন্ধি শিশুদের জন্য টয়লেট সুবিধা নেই। এ বয়সী শিশুদের মধ্যে যারা স্কুলে যায়না, তাদের বেশীরভাগের বাস শহরের বস্তিগুলোতে অথবা দুর্গম বা দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে। বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুল পার করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর হার প্রশংসনীয়। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে ঝরে পরে বিপুল সংখ্যক ছাত্র ছাত্রীরা। মেয়ে শিশুরা নিরাপত্তার অভাব এবং যৌন হয়রানির কারনে মাঝে মাঝে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বিকল্প শিক্ষা ব্যাবস্থায় এখনও রয়েছে অনেক ঘাটতি।

আমরা অনেক তথ্য জানি না এবং তথ্যের অভাবও আছে। যেমন আমরা অনেকেই জানি না যে কারওয়ান বাজার ও কুড়িলে পথকলি স্কুল আছে। গৃহকর্মীদের স্কুলের কথা ভাবা হচ্ছে। ফলে এটা যাঁরা পরিচালনা করছেন, তাঁরা অনেকের সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছেন না।শিশুশ্রম নিরসনের জন্য প্রতি জেলায় কর্মকর্তা আছেন, চাইল্ড ওয়েলফেয়ার বোর্ড আছে। তাঁরা কী কাজ করছেন। তাঁদের কাজ সম্পর্কে আমরা জানি কি না। তাঁদের কাজ শিশুশ্রম নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখছে কি না—এসব বিষয় তদারক করা প্রয়োজন। কিন্তু এই তদারকির দায়িত্বটা নিতে হবে কাউকে না কাউকে। না হয় সরকারকেই আরও কঠোর নীতিতে হাঁঠতে হবে। সারাদেশে শুদ্ধি অভিযান চলছে, আশার আলো জ্বলছে। শুনেছি ভালো-খারাপ পুলিশেরও তালিকা হচ্ছে। তবে আর দেরি কেন? একদিন ১২ জুন প্রতিরোধ না করে আজ থেকেই প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যাক 'শিশু শ্রম নিরসনে' একটা শুদ্ধি অভিযান। শুদ্ধি অভিযানে মুক্তি পাক আমার শিশু ভাই।

লেখক : সিনিয়র সাব-এডিটর, 'নতুন সময়'

(এ বিভাগে প্রকাশিত লেখা লেখকের নিজস্ব। নতুন সময়-এর নীতির সঙ্গে প্রকাশিত লেখা সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status