|
‘মৎস্যকন্যা-জলপরী’ মানুষের পৃথিবীতে এলো যেভাবে?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ‘মৎস্যকন্যা-জলপরী’ মানুষের পৃথিবীতে এলো যেভাবে? পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই জলপরীর পরিচিতি নানা নামে— কোথাও মারমেইড, কোথাও মাদার অফ ওয়াটার বা জলের মা, কোথাও সাইরেন, আবার কোথাও মৎস্যকন্যা। সম্প্রতি বাংলাদেশের নরসিংদীতে মনোহরদী উপজেলার একটি গ্রামের পুকুরে ‘জলপরী’র দেখা মিলেছে বলে গুজব উঠেছে। গুজবে কান দিয়ে চার-পাঁচ দিন ধরে আশপাশের উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকেও শত শত কৌতুহলী মানুষ পুকুরটিকে ঘিরে ভিড় জমিয়েছেন। এই গুজবকে ঘিরে গত কয়েকদিনে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে নানা ভিডিও। গুজব ছড়ানোর এই ঘটনায় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে সতর্ক করে মুচলেকাও নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। অবশ্য, শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনও মানুষ মারমেইড বা জলপরীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন এবং এ নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন; যদিও সমুদ্র বিজ্ঞানী এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় ইতোমধ্যেই ‘মৎস্যকন্যা বা জলপরী’ একটি মিথ বলে প্রমাণিত। বাংলাদেশে যেভাবে নতুন করে আলোচনায় ‘জলপরী’ নরসিংদীর যে পুকুর ঘিরে নতুন গুজবের সূত্রপাত, সেটি মনোহরদী উপজেলার আলালপুর গ্রামের কবির আহমেদ ভুঁইয়া নামে একজনের মালিকানাধীন পুকুর। গ্রামের প্রধান একটি সড়কের একদম পাশেই পুকুরটির অবস্থান। পুকুরটির মালিক কবির আহমেদ ভুঁইয়া সেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, সিলভার কার্পসহ দেশি নানা জাতের মাছ চাষ করেন। মূলত, চার-পাঁচদিন আগে প্রথমে স্থানীয় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পুকুরে কিছু একটা সাঁতার কাটছে এমন একটি ভিডিও শেয়ার করেন, তখনই এই জলপরী গুজবের শুরু বলে দাবি করেন মনোহরদীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান। ভাইরাল ওই ভিডিওতে দেখা যায়, পুকুরে পানির প্রায় উপরিভাগে কালো অবয়বের কিছু একটা সাঁতার কাটছে। এরপর থেকে গত কয়েকদিন ধরেই প্রচুর মানুষ পুকুরের আশেপাশে জড়ো হয়। শুধু ওই গ্রামই নয়, আশেপাশের অন্যান্য উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারাও সেখানে জড়ো হতে থাকেন। এই পুকুরটির মালিক গ্রামে থাকেন না, ঢাকায় বসবাস করেন। গত কয়েকদিনের ঘটনার খবর পেয়ে তিনি গ্রামে চলে যান। স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়ে সহায়তাও চান তিনি। মনোহরদীর ইউএনও মাহামুদুল হাসান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। স্থানীয় কিছু মানুষ পুকুরটিকে ঘিরে পূজা-অর্চনাও শুরু করে দেয়। শেষ পর্যন্ত গুজব ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন পুরো পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে। পুলিশকে বলা হয়েছে, মাঝে মাঝে গিয়ে মানুষজনকে যেন এখান থেকে সরিয়ে রাখে। ইউএনও বলেন, জিনিসটা কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এমনিতে বিষয়টা তো কিছুই না। কবির আহমেদ ভুঁইয়া ওই পুকুরে মাছ চাষ করেন। ওই মাছের ঝাঁক যখন একসাথে চলে, তখন ওপর থেকে বা সাইড থেকে দেখলে মনে হয় যে কোনো একটা কিছুর মুভমেন্ট হচ্ছে। আসলে মাছের ঝাঁক একসঙ্গে গেলে একটু বড় মাছের মতো মনে হতে পারে। কেবল একদিনই ওই মাছের ঝাঁকের একত্রে চলাচল দেখা গেছে এবং সেটিই ভিডিও করে কেউ কেউ কৃত্তিম প্রযুক্তির সহায়তায় গুজব ছড়িয়েছিল। পুকুরে মাছ ছাড়া আর কিছুই নেই জানিয়ে গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন মাহামুদুল হাসান। একইসঙ্গে কেবলমাত্র ভিউ পাওয়ার জন্য গুজব না ছড়াতে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদেরকেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইউএনও। এরইমধ্যে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে গুজব ছড়ানোর জন্য সতর্ক করে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ইউএনও মাহমুদুল হাসান। কোথাও মৎস্যকন্যা সৌভাগ্যের প্রতীক, কোথাও অমঙ্গলের মৎস্যকন্যা বা জলপরীর ইংরেজি প্রতিশব্দ মারমেইড মূলত দুইটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। যুক্তরাজ্যের রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, মারমেইড শব্দের একটি অংশ ‘মিয়ার’, প্রাচীন ইংরেজিতে যার অর্থ সমুদ্র। আরেকটি অংশ ‘মেইড’, যার অর্থ মেয়ে বা যুবতী। মারমেইড বললেই মানুষের চোখের সামনে যে অবয়ব সৃষ্টি হয় সেটি মূলত কাল্পনিক বা পৌরাণিক জলজ এক প্রাণী, যার শরীরের ওপরের অংশ এবং মাথা মানুষের মতো এবং নিচের অংশে মাছের মতো লেজ রয়েছে। শতাব্দী প্রাচীন ইংরেজী ভাষার বিশ্বকোষ এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় মারমেইড সম্পর্কে এমন কথাই বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মৎস্যকন্যার শুধুমাত্র নারী চরিত্রই রয়েছে তা নয়, বরং এটির পুরুষ চরিত্রও রয়েছে। ব্রিটানিকা বলছে, মারমেইড এবং মারম্যান হলো এমন অলৌকিক প্রাণী, যারা পরীর মতো জাদুকরী এবং ভবিষ্যত দেখার ক্ষমতার অধিকারী ছিল। মৎস্যকন্যা বা মারমেইডরা গান শুনতে ভালোবাসে এবং প্রায়ই নিজেরাও গান গায়। এরা অনেক দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হলেও অমর নয়। একইসঙ্গে, তাদের কোনো আত্মাও ছিল না। মারমেইড নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা ধরনের পৌরাণিক কাহিনী বা কল্পকথায় বা মিথ প্রচলিত রয়েছে। নাবিকদের লোককথায়, সমুদ্রের মতোই জলপরীর চরিত্রের প্রতীকও বেশ পরিবর্তনশীল, অর্থাৎ, জলপরী বা মৎস্যকন্যা সৌভাগ্য এবং অমঙ্গল উভয়েরই প্রতীক। কিছু কিছু সংস্কৃতিতে জলপরীকে সমুদ্রের প্রাণ ও উর্বরতার প্রতীক বিবেচনা করা হয়। কেননা মাসের পর মাস সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় থাকা যে নাবিক একঘেয়েমিতে ভুগছেন, পানির ওপর থেকে ভেসে আসা কোন জাদুকরী গান বা সুন্দরী নারীর এক ঝলক দেখতে পাওয়া হয়তো তার জন্য স্বস্তির কারণ হতো সেটি। আবার কিছু কিছু সংস্কৃতিতে জলপরীকে পানি বা জলের ধ্বংসাত্মক রূপের মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, মারমেইড বা জলপরীর দেওয়া উপহার নাবিকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় এবং ঝড়, উত্তাল সমুদ্র এবং বিপর্যয়ের অশুভ সংকেত বয়ে আনে। সমুদ্রযাত্রায় একটি জলপরী দেখতে পাওয়া জাহাজডুবির অশুভ লক্ষণ ছিল বলে মনে করা হতো। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুসারে, অনেক লোককথায় মানুষের রূপ ধারণ করতে পারে এমন জলপরী ও মানুষদের মধ্যে বিয়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে। ‘জলপরী’ রূপকথার উৎপত্তি কবে, কোথায়? হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে জলপরী বা মৎস্যকন্যা নিয়ে গল্প প্রচলিত রয়েছে। রূপকথার এইসব গল্পের উৎপত্তি মানব ইতিহাসের ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু সেটি সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে, সম্ভবত সমুদ্রের প্রাণী দেখার পর থেকেই এই গল্পের শুরু। রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচ বলছে, প্রত্নতাত্ত্বিকরা মেসোপটেমীয় রূপকথায় পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এক পুরুষ মৎস্যদেবতার কথা খুঁজে পান। তিনি কেলডীয় সাগরের দেবতা ইয়া বা ওয়ানেস। ওয়ানেস প্রতিদিন সমুদ্র থেকে উঠে এসে রাতে আবার সেখানে ফিরে যেতেন— এমন লোককথাও প্রচলিত আছে। খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার সালের দিকে সিরিয়ায় সবচেয়ে পুরোনো জলপরীর রূপকথাগুলোর একটির সন্ধান মেলে। সেই রূপকথা অনুসারে, আতারগাতিস নামে একজন দেবী মাছের রূপ ধারণ করতে একটি লেকের পানিতে ডুব দিয়েছিলেন। কিন্তু দেবতারা তার অসাধারণ সৌন্দর্য বিসর্জন দিতে দেননি, সে কারণে শুধু তার শরীরের নিচের অংশ মাছের রূপ নেয় এবং ওপরের অংশ মানবীর রূপেই রয়ে যায়। প্রাচীন মন্দির, মূর্তি এবং মুদ্রায় দেবী আতারগাতিসের অবয়ব খুঁজে পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশান সার্ভিসের ওয়েবসাইটে বলা আছে, প্রাচীন গ্রিক মহাকবি হোমার তার ‘দ্য ওডিসি’ গ্রন্থেও মারমেইডের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রাচীন প্রাচ্য অঞ্চলে মারমেইডদের শক্তিশালী সমুদ্র-ড্রাগনদের স্ত্রী বলে মনে করা হতো এবং তারা তাদের সঙ্গী ও স্থলভাগের সম্রাটদের মধ্যে বিশ্বস্ত বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করত। এতে আরও বলা হয়েছে, মারমেইডে বিশ্বাসের উৎপত্তি হয়তো মানবজাতির একেবারে প্রারম্ভিক যুগে, প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে শেষ প্রস্তর যুগে (প্যালিওলিথিক বা স্টোন এজ), যখন আধুনিক মানুষ স্থলভাগে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং ধারণা করা হয় সমুদ্রযাত্রাও শুরু করেছিল, তখনই গুহাচিত্রে প্রথম জাদুকরী নারীসদৃশ অবয়বের দেখা মেলে। আসিরীয় থেকে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপীয়ানসহ বিভিন্ন সভ্যতায় ভিন্ন ভিন্ন নামে জলপরী চিহ্নিত রয়েছে। রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচের ওয়েবসাইটে একেক সভ্যতার বিষয়গুলো এভাবে তুলে ধরা হয়েছে— মামি ওয়াটা পশ্চিম, দক্ষিণ এবং মধ্য আফ্রিকায় ‘মামি ওয়াটা’ নামের কাল্পনিক জল-দেবতাদের নিয়ে নানা ধরনের গল্প প্রচলিত রয়েছে। মামি ওয়াটা’র অর্থ ‘জলই মা’ বা ‘জলের মা’। প্রাচীন একাধিক আফ্রিকান সংস্কৃতি থেকে এই আত্মা বা দেবতাদের উৎপত্তি হওয়ায়, তাদের পরিচয়ের কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নেই। ঔপনিবেশিকতা এবং ষোড়শ শতকে দাসপ্রথার প্রসারের পর, ‘মামি ওয়াটা’র গল্প এবং বিশ্বাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সাইরেন গ্রিক ও রোমান পৌরাণিক কাহিনীর জলপরীগুলো বর্তমান ইউরোপীয় রূপকথার জলপরীগুলোর রূপ এবং চরিত্রের বেশ কাছাকাছি। প্রাচীন গ্রিক উপকথার অনেক জায়গায় সাইরেনদের জলপরী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়াম অফ ন্যাশনাল হিস্ট্রি বলছে, হোমারের ‘ওডিসি’ কাব্যে বর্ণিত ‘সাইরেন’রা নাবিকদের প্রলুব্ধ করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিত; যদিও শুরুতে তাদের পাখির শরীরের অধিকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, তবুও পরবর্তীকালে তাদের প্রায়শই মাছের লেজযুক্ত মৎস্যকন্যার রূপে চিত্রিত করা হয়েছে। এমনকি এই রূপান্তর এতটাই ব্যাপক যে অনেক ভাষায় ‘সাইরেন’ শব্দটির বিভিন্ন রূপ এখন ‘মৎস্যকন্যা’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। রুসালকি স্লাভিক পৌরাণিক কাহিনীর জলপরী বা জল-দেবতা হলো রুসালকি। শুরুতে এদের উর্বরতা ও কৃষির কল্যাণময় আত্মা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও আঠারো শতকে রুসালকিদের রূপ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মেরোজ যুক্তরাজ্যের রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আয়ারল্যান্ডের রূপকথায় মৎস্যকন্যারা মেরোজ নামে পরিচিত। নারী মেরোজরা তাদের সৌন্দর্য এবং লম্বা সবুজ চুলের জন্য পরিচিত। এদের পুরুষ রূপ বা পুরুষ মেরোজরা অত্যন্ত কুৎসিত, নিষ্ঠুর এবং মানুষের চেয়ে মাছের মতোই বেশি দেখতে। পুরুষ মেরোজদের এই নির্মম স্বভাবের কারণেই বলা হতো, এই জীবগুলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিল। সেলকি স্কটিশ রূপকথার সেলকিরা পুরোপুরি মাছের মতো না হলেও, এদের প্রায়ই জলপরীর রূপকথার সাথে তুলনা করা হয়। এই রূপ পরিবর্তনকারী প্রাণী সমুদ্রে থাকার সময় সীল মাছের মতো জীবন কাটায় এবং ডাঙায় আসলে মানুষের রূপ ধারণ করে। মেলুসিনা মধ্যযুগীয় ইউরোপের বহু রূপকথায় নারী আত্মাবিশিষ্ট মেলুসিনা নামক জলপরীর উল্লেখ রয়েছে, যার দেহে থাকে সাপ বা মাছের মত লেজ এবং কখনো কখনো ডানা। হাঙ্গেরি, ফ্রান্স এবং জার্মানিতে মেলুসিনা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত রূপকথাটিতে মেলুসিনাকে একজন জেদি মেয়ে হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যে কি না তার পরী মায়ের পক্ষ নিয়ে মানুষ বাবাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মা-ই তাকে শাস্তি হিসেবে একটি লেজ দিয়ে দেন। সুবর্ণমচ্ছা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রূপকথায় সুবর্ণমচ্ছা নামক এক রাজকন্যা জলপরীর গল্প রয়েছে। যার অর্থ সোনালী মাছ। ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে দেখা যায়, এর অন্যতম নায়ক হনুমান সমুদ্রের ওপর পাথর দিয়ে একটি সেতু তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তার এই পরিকল্পনা ভেস্তে দেয় সুবর্ণমচ্ছা জলপরী, তাকে সেতুর কাজ শেষ করতে বাধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুইজনের দেখা হওয়ার পর তারা একে অপরের প্রেমে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত সুবর্ণমচ্ছা হনুমানকে সেতুটি তৈরিতে সাহায্য করে। এই জলপরীকে এখন সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও লাওসের তাবিজ, পতাকা ও বিভিন্ন প্রতীকে সুবর্ণমচ্ছা জলপরীর প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলা হয়। মারমেইড যেভাবে স্থান করে নেয় সাহিত্য আর চলচ্চিত্রে আঠারো শতকে প্রকাশিত ডেনিশ লেখক হ্যানস ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ রূপকথার গল্পের বইটি বিশ্বজুড়ে জলপরী নিয়ে প্রকাশিত রূপকথার অন্যতম জনপ্রিয় একটি বই। ১৮৩৭ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে শিশুদের রূপকথার একটি সংকলনের অংশ হিসেবে প্রকাশিত এই গল্পটি থিয়েটার, অপেরাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে, সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ১৯৮৯ সালের ডিজনির একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। রয়েল মিউজিয়ামস গ্রীনউইচের তথ্য অনুযায়ী, রানি প্রথম এলিজাবেথের বিখ্যাত ‘আরমাডা পোর্ট্রেট’-এ দেখা যায়, তার রাজসিংহানের চেয়ারটিতে একটি জলপরী খোদাই করা রয়েছে। তবে, এটি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্য মতান্তর রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিক ফ্রান্স ফ্র্যাঙ্কেন আই ‘অ্যালিগোরি: দ্য শিপ অফ স্টেট’ নামের একটি ছবি আঁকেন। ছবির ঠিক সামনে ও মাঝখানে দুইটি জলপরীকে দেখা যায়, আয়নায় নিজেদের রূপ দেখে মুগ্ধ হতে দেখা যায়। এছাড়াও, একেক শতাব্দীতে একেক সভ্যতায় মারমেইড বা জলপরী বা মৎস্যকন্যার একেক রূপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
