|
জাপানে ঘরবন্দী লাখো মানুষ, কেন ঘর থেকে বের হতে চান না তারা?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() জাপানে ঘরবন্দী লাখো মানুষ, কেন ঘর থেকে বের হতে চান না তারা? এটি শুধু একজনের গল্প নয়। জাপানের বহু মানুষের জীবনে এমন অভিজ্ঞতা দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখার এই প্রবণতা জাপানে পরিচিত ‘হিকিকোমোরি’ নামে। হিকিকোমোরি বলতে সাধারণত এমন মানুষদের বোঝানো হয়, যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে এমন অবস্থা চলতে থাকাকে এর অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে হিকিকোমোরিতে থাকা সবাই যে একেবারেই ঘর থেকে বের হন না, তা নয়। কেউ প্রয়োজনীয় কাজের জন্য দোকানে যান, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলেন। আবার কেউ নিজের ঘর থেকেই বের হতে চান না। জাপান সরকারের ২০২২ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রায় ১৪ লাখ ৬০ হাজার মানুষ হিকিকোমোরি অবস্থার মধ্যে ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। অর্থাৎ, এটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; বরং দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ। হিকিকোমোরির পেছনে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক চাপ এবং মানসিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। স্কুলে সহপাঠীদের হাতে অপমানিত হওয়া, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, চাকরি হারানো কিংবা কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপ এসব অভিজ্ঞতা কাউকে ধীরে ধীরে সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিষণ্নতা ও সামাজিক উদ্বেগও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হিকিকোমোরিতে থাকা মানেই যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত, তা নয়। ব্যক্তিভেদে এর কারণ ও অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে। শুরুতে কেউ হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করেন কিংবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে চান না। ধীরে ধীরে বাইরে যাওয়ার অভ্যাস কমে আসে। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার পর মানুষের সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি করা, পড়াশোনায় ফেরা কিংবা চাকরি খোঁজা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অনেকের মনে কাজ করে সামাজিক বিচার ও প্রত্যাখ্যানের ভয়। দীর্ঘ বিরতির পর অন্যদের মুখোমুখি হলে কী বলবেন, এত দিন কোথায় ছিলেন এমন প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবেন, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। ফলে ঘরের মধ্যে থাকা সাময়িক স্বস্তি দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবনে ফেরার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। হিকিকোমোরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানে বিভিন্ন পরামর্শকেন্দ্র ও সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে। এসব উদ্যোগে ব্যক্তির সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি, পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দেওয়া এবং ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কাউকে জোর করে ঘরের বাইরে নিয়ে আসার পরিবর্তে তার সমস্যার কারণ বোঝা এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফেরার সহায়তাও কাজে আসতে পারে। ঘরের মধ্যে দিনের পর দিন কাটানো মানুষটিকে বাইরে থেকে অলস বা অসামাজিক মনে হতে পারে। কিন্তু তার ভেতরে কী ধরনের ভয়, উদ্বেগ কিংবা হতাশা কাজ করছে, তা না জেনে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। হিকিকোমোরি থেকে বেরিয়ে আসার পথ সবার জন্য এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ, আবার কারও প্রয়োজন হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার সহায়তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষদের দোষারোপ না করে তাদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা। কারণ, ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও তার পেছনে থাকা মানুষটির জীবনে আবার নতুন করে শুরু করার আকাঙ্ক্ষা একেবারে হারিয়ে গেছে এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
