ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ আশ্বিন ১৪৩৩
আমের মৌসুম শেষ, চট্টগ্রামের বাজারে কাটিমনের নতুন অধ্যায়
মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম
প্রকাশ: Wednesday, 16 September, 2026, 4:38 PM

আমের মৌসুম শেষ, চট্টগ্রামের বাজারে কাটিমনের নতুন অধ্যায়

আমের মৌসুম শেষ, চট্টগ্রামের বাজারে কাটিমনের নতুন অধ্যায়

আমের মৌসুম মানেই বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের ব্যস্ত বাজার। হিমসাগর, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, আম্রপালি কিংবা হাঁড়িভাঙার ঘ্রাণে এ সময় দেশের ফলের বাজার জমে ওঠে। কিন্তু সেই মৌসুম এখন শেষ। বাজার থেকে হারিয়ে গেছে জনপ্রিয় প্রায় সব মৌসুমি জাত। তবু আমের প্রতি ভোক্তার আগ্রহ কমেনি। বরং মৌসুমের শেষেও চট্টগ্রামের ফলের বাজারে দেখা মিলছে নতুন এক আমের-কাটিমন।

বারোমাসি হিসেবে পরিচিত এই জাতটি মূল মৌসুমের বাইরে আমের বাজার ধরে রাখছে। উত্তরাঞ্চলের বাগান থেকে আসা কাটিমন এখন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ফলের দোকানে জায়গা করে নিচ্ছে। ফলে আমের বাজারের প্রচলিত হিসাবও বদলাতে শুরু করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে নওগাঁর সাপাহারের আমের বাজারে দেখা গেছে, অন্য জাতের আমের সরবরাহ শেষ হয়ে গেলেও কাটিমনকে ঘিরে বেচাকেনা চলছে। ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বরের বাজারে কৃষকেরা ভ্যানে করে বাগানের কাটিমন নিয়ে আসেন। ক্রেতারাও আগ্রহ নিয়ে এসব আম কিনছেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, বাজারের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে যেন এখনও আমের মৌসুম চলছে।

মৌসুম শেষ হলেও গাছে আম

কাটিমনের বিশেষত্ব এখানেই। প্রচলিত আমের মতো নির্দিষ্ট কয়েক মাসে ফলন শেষ হয়ে যায় না। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচর্যা ও ফলন ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে কাটিমন বছরে দুই থেকে তিন দফা ফলন দিতে পারে। ফলে কৃষক নিজের সুবিধামতো সময়ে ফলন বাজারে তুলতে পারেন।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় কাটিমনের আবাদ বেড়ে প্রায় ২৫৫ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগের বছর ছিল ১৯০ হেক্টর। শুধু সাপাহারেই এ বছর প্রায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কাটিমন চাষ হচ্ছে।

অর্থাৎ আমের মূল মৌসুম শেষ হওয়ার পর যে সময়টায় সাধারণত বাজারে আমের সরবরাহ প্রায় থাকে না, সেই সময়টাকেই কাজে লাগাচ্ছেন কাটিমন চাষিরা।

অফসিজনে দামও ভালো

সাপাহারের বাজারে বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ কাটিমন প্রায় ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো কৃষক ভালো মানের আমের জন্য আরও বেশি দাম প্রত্যাশা করছেন। কৃষকদের বক্তব্য, মূল মৌসুমে নানা জাতের আমের প্রতিযোগিতা থাকলেও অফসিজনে কাটিমনের বিকল্প কম। ফলে চাহিদা অনুযায়ী দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি মৌসুমে জেলায় কাটিমনের হেক্টরপ্রতি ফলন ১২ থেকে ১৫ টন হতে পারে। ২৫৫ হেক্টর জমি থেকে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ টন। প্রতি কেজি গড়ে ১৮০ টাকা ধরে সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

চট্টগ্রামে কেন বাড়ছে সম্ভাবনা

চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম বড় ভোক্তা ও বাণিজ্যিক নগরী। সারা বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে ফল আসে। মৌসুমি আমের সরবরাহ শেষ হওয়ার পর বাজারে সাধারণত আমের বৈচিত্র্য কমে যায়। এই জায়গাটিই এখন কাটিমনের জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে।

নগরের ফলের দোকান, পাড়া-মহল্লার বাজার ও সুপারশপে অফসিজনে আম পাওয়ার সুযোগ ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যারা সারা বছর আম খেতে চান, তাদের কাছে কাটিমন একটি বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের হিসাবে, আমের মূল মৌসুমে ক্রেতারা জাত ও দামের তুলনা করে আম কেনেন। কিন্তু মৌসুম শেষ হলে ভালো মানের আমের সরবরাহ কমে যায়। তখন তুলনামূলক বেশি দাম হলেও একটি অংশের ক্রেতা আম কিনতে আগ্রহী থাকেন। এ কারণে অফসিজন আমের জন্য আলাদা বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কৃষকের আয়েও নতুন হিসাব

কাটিমনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হচ্ছে—কৃষকের আয়কে একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের মধ্যে আটকে থাকতে হয় না। প্রচলিত জাতের আম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজার থেকে উঠে গেলেও কাটিমনের ফলন ব্যবস্থাপনা দীর্ঘ সময় ধরে করা যায়।

সাপাহারের কয়েকজন কৃষক জানিয়েছেন, বাগানে মুকুল থাকায় নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্তও ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ কেউ জানিয়েছেন, পরিচর্যার মাধ্যমে বছরের বিভিন্ন সময় ফলন নেওয়া সম্ভব। এর ফলে বাগানে শ্রমিকের কাজও দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যাচ্ছে।

একজন কৃষক জানিয়েছেন, তার কাটিমনের বাগানে সারা বছর ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। আরেক চাষি আগের বছরের তুলনায় নিজের জমিতে কাটিমনের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছেন।

শুধু লাভ নয়, খরচও আছে

তবে কাটিমন চাষকে শুধু লাভের হিসাব দিয়ে দেখছেন না কৃষকেরা। সারা বছর ফলন নিতে হলে নিয়মিত পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সেচ এবং সময়মতো ফল সংগ্রহ করতে হয়। ফলে উৎপাদন খরচও কম নয়।

কৃষকদের অভিজ্ঞতা বলছে, ভালো ফলন পেলেই লাভ নিশ্চিত হয় না। বাজারদর, ফলের মান, উৎপাদন খরচ এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর শেষ পর্যন্ত লাভের পরিমাণ নির্ভর করে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো দূরের বাজারে আম পাঠাতে হলে পরিবহন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বদলে যাচ্ছে আমের বাজারের পুরোনো ক্যালেন্ডার

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আমের বাজারের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল ছিল। বছরের মাঝামাঝি কয়েক মাসে বাজারে আমের সরবরাহ বাড়ত, এরপর ধীরে ধীরে তা কমে যেত। কিন্তু কাটিমনসহ দেরিতে ফলন দেওয়া জাতের বিস্তারে সেই পুরোনো চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আশ্বিনা, বারি-৪, গৌড়মতি ও কাটিমনের মতো জাত মূল মৌসুমের পরও বাজারে আসে। তবে কাটিমনের ক্ষেত্রে বছরে একাধিকবার ফলন নেওয়ার সুযোগ থাকায় এটি অন্য দেরি জাতের তুলনায় আলাদা সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

সামনে বড় বাজার চট্টগ্রাম

উত্তরাঞ্চলের বাগানগুলোতে কাটিমনের আবাদ বাড়তে থাকলে এর প্রভাব দেশের বড় ভোক্তা শহরগুলোর বাজারেও পড়তে পারে। চট্টগ্রাম সেই তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ। নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরের বিভিন্ন সময় চট্টগ্রামের বাজারে কাটিমন পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।

এতে একদিকে যেমন ভোক্তারা মৌসুমের বাইরেও আম কেনার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে কৃষকেরাও একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারবেন।

অর্থাৎ কাটিমন শুধু আরেকটি নতুন জাতের আম নয়; এটি দেশের আমের বাজারে ‘মৌসুম’ ধারণাটিকেই ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আমের বাজারের বাইরে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর কিংবা নভেম্বরেও যদি একই ফলের বেচাকেনা জমে ওঠে, তাহলে চট্টগ্রামের মতো বড় নগরীতে অফসিজন আমের জন্য আলাদা বাণিজ্যিক বাজার গড়ে ওঠা সময়ের ব্যাপার হতে পারে।

আমের মৌসুম শেষ হয়েছে-কিন্তু আমের বাজার শেষ হয়নি। কাটিমনের হাত ধরে সেই বাজারই এখন নতুন সময়ের দিকে এগোচ্ছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status