|
যৌনতা থেকে রাজনীতি, ভারতে আটকে যায় আলোচিত এই ১০ সিনেমা
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() যৌনতা থেকে রাজনীতি, ভারতে আটকে যায় আলোচিত এই ১০ সিনেমা ভারতে চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্র দেয় কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড বা সিবিএফসি। তবে ইতিহাস বলছে, একটি সিনেমার ভাগ্য নির্ধারণে শুধু সার্টিফিকেশন বোর্ডই শেষ কথা নয়। কখনো সরকার, কখনো আদালত, কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা সামাজিক চাপ—সব মিলিয়েই থমকে গেছে বহু আলোচিত সিনেমার পথচলা। এমন অনেক সিনেমা আছে, যেগুলো একসময় নিষিদ্ধ বা কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে কোনোটি মুক্তি পেয়েছে, কোনোটি কাটছাঁটের পর দর্শকের সামনে এসেছে, আবার কোনোটি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহের বাইরে রয়ে গেছে। রাজনীতি থেকে যৌনতা, বিভিন্ন কারণে আলোচিত এমন ১০ সিনেমার গল্প। ‘আঁধি’: জরুরি অবস্থার ঝড়ে থেমে যাওয়া সিনেমা গুলজারের পরিচালনায় ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আঁধি’ আজ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুচিত্রা সেন ও সঞ্জীব কুমার। সুচিত্রা অভিনয় করেন আরতি দেবী নামের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রীর চরিত্রে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অতীতের প্রেম; সব মিলিয়ে চরিত্রটি ছিল সময়ের তুলনায় বেশ জটিল ও আধুনিক। তবে সিনেমাটি মুক্তির পরই শুরু হয় বিতর্ক। অনেকের ধারণা ছিল, আরতি দেবীর চরিত্রটি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আদলে তৈরি। বিশেষ করে চরিত্রটির চেহারা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়। এরপর জরুরি অবস্থার সময় সিনেমাটির প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। নির্মাতারা অবশ্য বরাবরই দাবি করেছেন, এটি ইন্দিরা গান্ধীর জীবনী নয়। জরুরি অবস্থার অবসান ও রাজনৈতিক পালাবদলের পর ১৯৭৭ সালে সিনেমাটি আবার মুক্তির সুযোগ পায়। ‘সিকিম’: সত্যজিৎ রায়ের হারিয়ে যাওয়া ছবি সত্যজিৎ রায়ের নামের সঙ্গে সাধারণত কাহিনিচিত্রের কথাই বেশি মনে পড়ে। কিন্তু তাঁর নির্মিত সবচেয়ে আলোচিত তথ্যচিত্রগুলোর একটি ‘সিকিম’ দীর্ঘ সময় দর্শকের নাগালের বাইরে ছিল। ১৯৭১ সালে তৎকালীন সিকিম রাজতন্ত্রের সময় তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। কয়েক বছর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের অংশ হওয়ার পর ছবিটি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। সিকিমকে একটি স্বাধীন রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর কারণেই ছবিটির প্রদর্শন ভারতের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন এটি ভারতে কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। অবশেষে প্রায় চার দশক পর ২০১০ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বহু বছর ধরে আড়ালে থাকা সত্যজিৎ রায়ের এই কাজটি আবার দর্শকের সামনে আসে। ‘ব্যান্ডিট কুইন’: ফুলন দেবীর আপত্তি শেখর কাপুর পরিচালিত ‘ব্যান্ডিট কুইন’ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত জীবনীভিত্তিক ছবিগুলোর একটি। ডাকাত রানী হিসেবে পরিচিত ফুলন দেবীর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত ছবিটির নামভূমিকায় অভিনয় করেন সীমা বিশ্বাস। ১৯৯৪ সালে মুক্তির আগে থেকেই সিনেমাটি বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। কারণ, এতে ধর্ষণ, নির্যাতন ও নগ্নতার দৃশ্য অত্যন্ত সরাসরি ও নির্মমভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় আপত্তি আসে ফুলন দেবীর কাছ থেকেই। তাঁর দাবি ছিল, তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো বিকৃতভাবে দেখানো হয়েছে এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় পর্দায় আনা হয়েছে। আইনি জটিলতায় একসময় সিনেমাটির প্রদর্শনও আটকে যায়। পরে বাধা কাটিয়ে মুক্তি পায় ছবিটি। বিতর্কের মধ্যেও ‘ব্যান্ডিট কুইন’ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয় এবং ভারতীয় বাস্তবতাকে পর্দায় নির্ভীকভাবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকে। ‘কামসূত্র: আ টেল অব লাভ’: যৌনতা নিয়ে আপত্তি মীরা নায়ার পরিচালিত ‘কামসূত্র: আ টেল অব লাভ’ মুক্তির আগেই আলোচনায় আসে এর বিষয়বস্তু ও দৃশ্যায়নের কারণে। ১৯৯৬ সালের এই ইংরেজি ভাষার ছবিতে অভিনয় করেন নবীন অ্যান্ড্রুজ, সরিতা চৌধুরী, রেখা ও ইন্দিরা ভার্মা। রাজপ্রাসাদ, প্রেম, কামনা, ঈর্ষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে নির্মিত ছবিটি ভারতের বাইরে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল। কিন্তু ভারতে ছবিটির খোলামেলা যৌনদৃশ্য নিয়ে আপত্তি ওঠে। ফলে মুক্তির পথ সহজ ছিল না। পরে পরিবর্তিত ও সম্পাদিত সংস্করণ নিয়ে ছবিটি ভারতীয় দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। সিনেমাটি সেই সময়ের একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছিল, ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসের অংশ হিসেবে যৌনতা নিয়ে কথা বলা যাবে; কিন্তু সেই বিষয় পর্দায় কতটা সরাসরি দেখানো যাবে? ‘আমু’: দাঙ্গার স্মৃতি নিয়ে আপত্তি ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার পটভূমিতে নির্মিত ‘আমু’ পরিচালনা করেন সোনালি বোস। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন কঙ্কণা সেনশর্মা।সিনেমাটির গল্প এক তরুণীকে ঘিরে, যিনি নিজের অতীত ও পরিচয়ের সন্ধান করতে গিয়ে ১৯৮৪ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার ইতিহাসের মুখোমুখি হন।বিষয়টি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথা তুলে ছবিটির প্রদর্শন নিয়ে আপত্তি ওঠে। টেলিভিশনে প্রচার নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। পরে বেশ কিছু দৃশ্য ও সংলাপে পরিবর্তন আনার পর সিনেমাটি মুক্তির অনুমতি পায়। কিন্তু ‘আমু’র ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ভারতের ইতিহাসের এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো নিয়ে সিনেমা বানানোও নির্মাতাদের জন্য সহজ নয়। ‘পাঁচ’: অনুরাগ কাশ্যপের মুক্তি না–পাওয়া ছবি অনুরাগ কাশ্যপের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিতর্ক যেন তাঁর সঙ্গী। তাঁর পরিচালিত ‘পাঁচ’ সেই বিতর্কিত ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা।ক্রাইম ড্রামা ঘরানার ছবিটিতে ছিল সহিংসতা, মাদক, অপরাধ, অশালীন ভাষা ও যৌনতার উপস্থিতি। এসব কারণ দেখিয়ে ছবিটি সার্টিফিকেশন পেতে দীর্ঘ জটিলতায় পড়ে। সিনেমাটি বিভিন্ন সময়ে প্রদর্শিত ও আলোচিত হলেও ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে এর স্বাভাবিক মুক্তি আর হয়নি। ফলে ‘পাঁচ’ ভারতীয় সিনেমার সেই বিখ্যাত ছবিগুলোর একটি হয়ে আছে, যেটি দর্শকদের মধ্যে কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে; কিন্তু দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির ইতিহাস নেই। ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’: নির্ভয়ার ঘটনার পর নতুন বিতর্ক ২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ঘটনা নিয়ে ব্রিটিশ নির্মাতা লেসলি উদউইন নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘ইন্ডিয়াজ ডটার’।২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বিবিসিতে তথ্যচিত্রটি সম্প্রচারিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ভারতে এর প্রদর্শন নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।বিশেষ করে মামলার এক দণ্ডিত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার এবং সেখানে নারীদের নিয়ে তাঁর মন্তব্য দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি করে। ভারত সরকার তথ্যচিত্রটির প্রদর্শন বন্ধের উদ্যোগ নেয়। তথ্যচিত্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত হলেও ভারতে সেটি মুক্তি পায়নি। এই ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তোলে, অস্বস্তিকর বাস্তবতা পর্দায় তুলে ধরা কি সমাজের জন্য ক্ষতিকর, নাকি সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়াই প্রয়োজন? ‘দ্য পেইন্টেড হাউস’: নগ্নতা নিয়ে আপত্তি ২০১৫ সালের মালয়ালম ছবি ‘দ্য পেইন্টেড হাউস’ পরিচালনা করেন সন্তোষ বাবুসেনান ও সতীশ বাবুসেনান। ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন নেহা মহাজন। নারীর শরীর ও নগ্নতার দৃশ্যায়ন নিয়ে ছবিটির বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ। নির্মাতাদের কয়েকটি দৃশ্য বাদ বা পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া হয়। নির্মাতারা সেই পরিবর্তনে রাজি হননি। ফলে ছবিটির ভারতীয় মুক্তি নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়। এই সিনেমার বিতর্ক মূলত আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে, নগ্নতা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অশ্লীলতা, নাকি শিল্পের প্রেক্ষাপটে সেটির অর্থ ভিন্ন হতে পারে? ‘নীলম’: প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের প্রশ্ন তামিল ছবি ‘নীলম’ তৈরি হয়েছিল শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। শ্রীলঙ্কার তামিল জনগোষ্ঠী, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে নির্মিত হওয়ায় ছবিটি ভারতের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় বাধার মুখে পড়ে।ছবিটি মুক্তি পেলে ভারত ও শ্রীলঙ্কার কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে, এমন আশঙ্কার কথা সামনে আসে। সিনেমার শিল্পমূল্য বা গল্পের বাইরে গিয়ে এখানে প্রধান হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। ফলে ‘নীলম’ দেখিয়ে দেয়, কখনো কখনো একটি সিনেমার ভাগ্য নির্ধারণ করে পর্দার বাইরের ভূরাজনীতিও। ‘সন্তোষ’: আন্তর্জাতিক প্রশংসা, কিন্তু ভারতে মুক্তি নেই এই তালিকার সবচেয়ে সাম্প্রতিক আলোচিত নাম ‘সন্তোষ’। ব্রিটিশ-ভারতীয় নির্মাতা সন্ধ্যা সুরি পরিচালিত ছবিটি ২০২৪ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন সাহানা গোস্বামী। উত্তর ভারতের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবির গল্প এক তরুণীকে নিয়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি পুলিশে যোগ দেন এবং এক দলিত কিশোরীর হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্ধকার বাস্তবতার মুখোমুখি হন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি ছবিটি যুক্তরাজ্যের হয়ে অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগেও প্রতিনিধিত্ব করেছিল। কিন্তু ভারতে সিনেমাটির মুক্তি আটকে যায়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশি সহিংসতা, জাতপাত, নারীবিদ্বেষ ও ইসলামবিদ্বেষের মতো সংবেদনশীল বিষয় তুলে ধরার কারণে সিবিএফসি ব্যাপক কাটছাঁটের দাবি করেছিল। নির্মাতা সন্ধ্যা সুরি সেই পরিবর্তনে রাজি হননি। ফলে ভারতীয় প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির মুক্তি হয়নি। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
