ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ২৪ আগস্ট ২০২৬ ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সরকারের ছয় মাস নিয়ে যে মূল্যায়ন করল সিপিডি
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Monday, 24 August, 2026, 3:55 PM

সরকারের ছয় মাস নিয়ে যে মূল্যায়ন করল সিপিডি

সরকারের ছয় মাস নিয়ে যে মূল্যায়ন করল সিপিডি

নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এখনো নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রমের পর্যালোচনা তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া গেলেও নেতিবাচক প্রবণতার আধিক্য রয়েছে। এসব সমস্যার বড় অংশই কাঠামোগত।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনায় জানানো হয়, সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে মোট ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষাসহ মোট ৯টি খাত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। শুধু ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপগুলোকেই মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি, কমেনি জীবনযাত্রার চাপ

সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে।

তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো বেশি। পাশাপাশি প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থাকায় মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি বলে মনে করছে সিপিডি।

রাজস্ব আদায় ও বিনিয়োগে উদ্বেগ

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে সময়ে মোট কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। ফলে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সিপিডি। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপিতে কাটছাঁটের চাপ বাড়তে পারে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে সিপিডি। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে। কমেছে নিট বিদেশি বিনিয়োগও।

সিপিডির মতে, এসব সূচকে দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।

গ্যাস সংকটে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন

চলমান গ্যাস সংকটকে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে সিপিডি। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতার কারণে গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের সাধারণ সূচক এবং উৎপাদনশিল্পের সূচক—দুটির প্রবৃদ্ধিই শূন্যে নেমে এসেছে। একই সময়ে শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণও কমেছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়বদ্ধ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি।

ব্যাংক খাতে সংস্কার শুরু হলেও আস্থা নিয়ে প্রশ্ন

ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সিপিডির মতে, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রয়োজন।

রিজার্ভ বাড়লেও বহিঃখাতে চাপ

বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয় বলে মনে করছে সিপিডি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে বিপিএম-৬ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে গেছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে দেখছে সিপিডি।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতির কারণ কী

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতির পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কর্মসূচির অভাব, দুর্বল রাজস্ব ও আর্থিক কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যে চাপ, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ঘাটতি।

সিপিডির মতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে শুধু মূল্যস্ফীতি কমার মাধ্যমে মূল্যায়ন করলে চলবে না। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও সুদের হারে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দৃশ্যমান উন্নতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি।

সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির তাগিদ

দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সহায়তা করতে আগামী অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত ‘মূল বাজেট’ বা কোর বাজেট প্রস্তুতের পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, এ বাজেট বাস্তব সময়ের তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিতে তৈরি হওয়া উচিত।

পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংক সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ, নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সংসদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

সামগ্রিক মূল্যায়নে সিপিডি বলছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অর্থনীতির প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status