|
যে ৩ কারণে ভেস্তে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি সমঝোতা
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ছবি : সংগৃহীত শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা থাকলেও, এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজ নিজ অবস্থান থেকে এতে স্বাক্ষর করেছেন বলে উভয় পক্ষ নিশ্চিত করেছে। ১৪ দফার এই প্রাথমিক রূপরেখাকে চূড়ান্ত চুক্তির ভিত্তি ধরা হচ্ছে। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষকে বিস্তারিত আলোচনার ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। এই সমঝোতার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে আলোচনা এবং দেশটির জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর বিপরীতে ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে তারা কোনোদিন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এটিকে যেন চূড়ান্ত চুক্তি মনে না করা হয়। আলোচনায় আশানুরূপ অগ্রগতি না হলে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মন্তব্য করেছেন, ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এখনো দূর হয়নি। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূলত তিনটি বিশেষ ইস্যু এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যার ফলে ভেস্তে যেতে পারে সব আয়োজন। ১. লেবানন সংকট: প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে লেবাননকে সামগ্রিক যুদ্ধবিরতির আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ইরানের স্পষ্ট দাবি, লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী পুরোপুরি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই যুদ্ধের প্রকৃত অবসান সম্ভব নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান ভিন্ন; তাদের মতে, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনার উপস্থিতি এই চুক্তির শর্তের মধ্যে পড়ে না। এমনকি এই শান্তি আলোচনার সমান্তরালে লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও এই বিষয়ে ইরানের অবস্থানকে সমর্থন জুগিয়েছে। সংগঠনটি ইঙ্গিত দিয়েছে যে, আগামী দিনের আলোচনাগুলোতে তেহরান লেবানন থেকে ইসরায়েলি সৈন্য সরানোর দাবিটিকে জোরালোভাবে তুলবে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো উত্তেজনা তৈরি হলে চলমান পুরো কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি মাঝপথেই ভেঙে পড়তে পারে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. এইচ.এ. হেলিয়ার বলেন, এই কূটনৈতিক অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে কাজ করছে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান। ২.ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত: চুক্তির অন্যতম জটিল ও বিতর্কিত দিক হলো ইরানের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গচ্ছিত রয়েছে। সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের এই পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত, তবে এই বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়ামের শেষ পরিণতি কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। চলতি আলোচনায় এই ইউরেনিয়ামের সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে আইএইএর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রাখার একটি প্রস্তাব বিবেচনাধীন রয়েছে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আগামী ৬০ দিনের চুলচেরা আলোচনার ওপর। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইরান যদি কোনো কারণে আবারও উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো গোপন প্রস্তুতির অভিযোগ তোলে, তবে তা অঞ্চলটিকে নতুন করে সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ৩. হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ: বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান করিডর হরমুজ প্রণালি পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত করা এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। চলমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সামুদ্রিক রুট দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা গত ফেব্রুয়ারি থেকে সংঘাতের কারণে পুরোপুরি অচল হয়ে রয়েছে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সাগরের মাইন অপসারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার রূপরেখা রয়েছে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে প্রথম ৬০ দিন এই প্রণালিটি সম্পূর্ণ টোলমুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে তারা এই পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে এক ধরনের সেবা ফি বা কর আদায় করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো এমন কোনো ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করছে। এর পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারির মতে, এই সমুদ্রপথকে শতভাগ নিরাপদ ও মাইনমুক্ত করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি আসলেই টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শিপিং ও বীমা কোম্পানিগুলো এই রুটে জাহাজ পাঠাতে সতর্ক অবস্থানে থাকবে। পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রশমনে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুললেও, এটি আপাতত কেবল একটি প্রাথমিক কাঠামোগত রূপরেখা মাত্র। এই সমঝোতার পর সামনে থাকা ৬০ দিনের কঠিন আলোচনা ও দরকষাকষিয়েই নির্ধারণ করবে—এই উদ্যোগ স্থায়ী শান্তির পথে হাঁটবে নাকি নতুন কোনো সংঘাতের জন্ম দেবে। সূত্র: বিবিসি
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
