ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ১১ জুন ২০২৬ ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাজেটের ব্রিফকেস: দুই শতকের ঐতিহ্যের পেছনের গল্প
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 10 June, 2026, 10:52 PM

বাজেটের ব্রিফকেস: দুই শতকের ঐতিহ্যের পেছনের গল্প

বাজেটের ব্রিফকেস: দুই শতকের ঐতিহ্যের পেছনের গল্প

দেশের অর্থনীতি যখন রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হওয়ায় এবারের বাজেটকে ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় মহলেই রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। 

প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার দিন একটি দৃশ্য বারবার ফিরে আসে। সংসদ ভবনের সামনে সাংবাদিকদের ক্যামেরার ঝলকানির মধ্যে অর্থমন্ত্রী গাড়ি থেকে নামেন। তার হাতে থাকে একটি ব্রিফকেস। সেই ব্রিফকেসের দিকে তাকিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— এতে কি দেশের লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেট থাকে? নাকি এটি কেবল একটি প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতা? 

বাস্তবে ওই ব্রিফকেসে কোনও অর্থ থাকে না। থাকে বাজেট বক্তৃতার খসড়া, আয়-ব্যয়ের হিসাব, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত প্রস্তাব এবং অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। কিন্তু এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্রিফকেসটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতীক, যার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রায় দুই শতক আগে ব্রিটেনে।

মানিব্যাগ থেকে ব্রিফকেস

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খানের বই ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ থেকে জানা যায়, আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে ব্রিফকেসের ইতিহাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের পর অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। সরকারের আয়-ব্যয়, করনীতি এবং ব্যয়ের পরিকল্পনা সংক্রান্ত নথিপত্রের পরিমাণও বাড়তে থাকে। একসময় এসব কাগজপত্র সাধারণ থলি বা মানিব্যাগে বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে প্রয়োজন হয়ে পড়ে বড় আকারের একটি ব্যাগের। সেখান থেকেই বাজেট নথি বহনের জন্য ব্রিফকেস ব্যবহারের সূচনা।

তবে এরও আগে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী স্যার রবার্ট ওয়ালপুলের সময় থেকে বাজেট-সংক্রান্ত নোট ও প্রস্তাব একটি বিশেষ থলিতে সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। বিভিন্ন মহল থেকে আসা কর ও ব্যয় সংক্রান্ত সুপারিশ তিনি সেই থলিতে জমা রাখতেন এবং বাজেট তৈরির সময় সেগুলো ব্যবহার করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, সেখান থেকেই আধুনিক বাজেট ব্রিফকেসের ধারণার ভিত্তি তৈরি হয়। 

‘বাজেট’ শব্দের জন্ম যেভাবে

অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে যে, ‘বাজেট’ শব্দটির উৎপত্তিও আসলে একটি ব্যাগ বা থলির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ভাষাবিদদের মতে, ইংরেজি ‘Budget’ শব্দটি এসেছে প্রাচীন ফরাসি শব্দ ‘Bougette’ থেকে। এর অর্থ হলো ছোট চামড়ার থলি, ব্যাগ বা মানিব্যাগ। অতীতে সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব ওই ধরনের থলিতে ভরে আইনসভায় আনা হতো। সময়ের সঙ্গে সেই থলির নামই পরিণত হয় রাষ্ট্রের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনার নামে।

অপরদিকে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ষোড়শ শতাব্দীতে ‘Opening the Budget’ কথাটি ব্যবহার করা হতো এমন অর্থে, যেখানে কেউ গোপন বা অপ্রকাশিত কোনও তথ্য প্রকাশ করছে। আজকের বাজেট ঘোষণার ধারণার সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল রয়েছে।

লাল ব্রিফকেসের ইতিহাস 

বাজেট ব্রিফকেসকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করে তোলেন ব্রিটিশ রাজনীতিক উইলিয়াম ইয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোন। ১৮৬০ সালে তিনি বাজেটের নথিপত্র বহনের জন্য একটি বিশেষ লাল রঙের বাক্স ব্যবহার করেন। ওই বাক্সে সোনালি রঙে ব্রিটিশ রানির প্রতীক খোদাই করা ছিল।

পরবর্তীকালে সেই লাল বাক্সই ব্রিটিশ বাজেটের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রীরা একই ধরনের লাল ব্রিফকেস বা ‘রেড বক্স’ ব্যবহার করে সংসদে বাজেট পেশ করেছেন। বিশ্বের অনেক দেশ, বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আওতায় থাকা দেশগুলোও পরে একই রীতি অনুসরণ করে।

উপমহাদেশে ব্রিফকেসের আগমন

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম আধুনিক বাজেট উপস্থাপন করেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জেমস উইলসন। ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল কলকাতায় তিনি ১৮৬০-৬১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন। 

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বাজেট ব্রিফকেসের রীতিও উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদে বাজেট উপস্থাপনের সময়ও একই ঐতিহ্য অনুসরণ করা হয়েছিল।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন দেশের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন। সেদিনও তার হাতে ছিল বাজেট ব্রিফকেস। এরপর থেকে বাংলাদেশের প্রায় সব অর্থমন্ত্রীই এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই গোপনীয়তা? 

বাজেট ব্রিফকেস ব্যবহারের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো গোপনীয়তা রক্ষা। বাজেটে কোন পণ্যের ওপর কর বাড়বে বা কমবে, কোন খাতে নতুন প্রণোদনা আসবে কিংবা কোন শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে— এসব তথ্য আগাম ফাঁস হয়ে গেলে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। 

ব্যবসায়ীরা আগাম তথ্য জেনে পণ্য মজুত করতে পারেন, শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন হতে পারে কিংবা আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে কৃত্রিম প্রভাব তৈরি হতে পারে। তাই বাজেট ঘোষণার আগে এসব তথ্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষা করা অর্থমন্ত্রীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তথ্য ফাঁস হয়ে পদ হারানোর নজির 

বাজেট গোপনীয়তা ভঙ্গের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ১৯৪৭ সালে ব্রিটেনে। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী হিউ ডাল্টন সংসদে বাজেট পেশ করতে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু কর-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে ফেলেন। সাংবাদিকরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই তথ্য সংবাদপত্রে পাঠিয়ে দেন।

ফলে ডাল্টন সংসদে বক্তব্য শুরু করার আগেই বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে যায়। বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ডাল্টনকে পদত্যাগ করতে হয়। আজও এই ঘটনাকে বাজেট গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

লাল থেকে কালো, মেরুন থেকে ডিজিটাল ট্যাব

যদিও ঐতিহ্যগতভাবে বাজেট ব্রিফকেসের রং লাল, সময়ের সঙ্গে এর পরিবর্তনও ঘটেছে। বাংলাদেশে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে কখনও মেরুন, কখনও কালো রঙের ব্রিফকেস ব্যবহার করতে দেখা গেছে। আবার একাধিক অর্থমন্ত্রী ভিন্ন নকশার ব্রিফকেস ব্যবহার করেছেন।ব্রিফকেস

বিশ্বব্যাপীও এই ঐতিহ্যে পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। ২০১৯ সালে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ব্রিটিশ আমলের ব্রিফকেস বাদ দিয়ে লাল কাপড়ে মোড়ানো ঐতিহ্যবাহী ‘বহি-খাতা’ হাতে বাজেট উপস্থাপন করেন। এটিকে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসার প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।  এরপর ২০২১ সালে তিনি কাগজের পরিবর্তে একটি ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ডিজিটাল বাজেট উপস্থাপন করেন।

এখন প্রতীক, তবু গুরুত্ব অটুট 
প্রযুক্তির যুগে বাজেট তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই এখন প্রায় সম্পূর্ণ ডিজিটাল। বাজেটের নথি তৈরি, সংশোধন, সংরক্ষণ এবং বিতরণ— সবকিছুই কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয়। তবু বাজেটের দিন অর্থমন্ত্রীর হাতে ব্রিফকেস দেখার অপেক্ষায় থাকেন মানুষ। কারণ এটি নিছক একটি ব্যাগ নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, গোপনীয়তা, ঐতিহ্য এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রতীক।

প্রতি বছর সংসদের পথে অর্থমন্ত্রীর হাতে থাকা সেই ব্রিফকেস যেন দেশের অর্থনীতির একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনার বার্তা বহন করে। তার ভেতরে থাকে না কোনও নগদ অর্থ, কিন্তু থাকে কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা। আর সেই কারণেই বাজেটের দিন ব্রিফকেসটি এখনও দেশের সবচেয়ে আলোচিত ‘ব্যাগ’ হয়ে থাকে। 

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status