|
ধর্ষণ রোধে কঠোর শাস্তি, তবু কেন প্রশ্নের মুখে সৌদি আরব?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ধর্ষণ রোধে কঠোর শাস্তি, তবু কেন প্রশ্নের মুখে সৌদি আরব? কঠোর আইন ও শাস্তির কারণে সৌদি আরবে ধর্ষণের হার কম বলে দাবি করা হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বিচারপ্রক্রিয়া, প্রমাণ সংগ্রহ এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ধর্ষণ নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদন, বহুল আলোচিত মামলা এবং বিচারিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে বারবার আলোচনায় এসেছে সৌদির আইনব্যবস্থা। বিশেষ করে ধর্ষণ মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণের ধরন ও ভুক্তভোগীদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বহুবার। সামাজিক ব্যবস্থা: আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সৌদি আরবের সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থায় যে কোনো অপরাধ প্রকাশ বা প্রচার করাকে অনুৎসাহিত করা হয়। ২০০২ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র শূন্য দশমিক ৩ জন ধর্ষণের ঘটনা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। সৌদি আরবে অনেক সময় ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বললে উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে ভুক্তভোগীর সাজা দ্বিগুণ করার নজিরও রয়েছে। লোকলজ্জা ও ভবিষ্যৎ সামাজিক প্রতিবন্ধকতার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী পরিবারই আইনি অভিযোগ দায়েরের পরিবর্তে ঘটনা চেপে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করে। কারণ, ঘটনা জানাজানি হলে ভুক্তভোগী নারীর সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়। সৌদির আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা অত্যন্ত দুরূহ। শরিয়া আইন অনুযায়ী, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের অপরাধ স্বীকার না করে, তবে অপরাধ প্রমাণে ভুক্তভোগী নারীকেই চারজন যোগ্য পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে হয়। উপযুক্ত শারীরিক তথ্য-প্রমাণ ও প্রত্যক্ষ সাক্ষীর অভাবে বহু মামলা বিচারের জন্য আদালতে গ্রহণই করা হয় না। দণ্ডের বিভিন্ন রূপ ও আইনি ফাঁকফোকর সৌদি আরবে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত দণ্ডবিধি বা ধর্ষণের কোনো আধুনিক আইনি ব্যাখ্যা নেই। সব বিচারই চলে শরিয়া আইনের নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী। যদি কোনো মামলায় ধর্ষণ প্রমাণিত হয় এবং আদালত হুদুদ বা মৃত্যুদণ্ড ধার্য করেন, তবে শিরোশ্ছেদের মাধ্যমে সাজা কার্যকর করা হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সাক্ষীর অভাব থাকলে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে চাবুক মারা বা কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ধর্ষককে শাস্তি না দিয়ে ভুক্তভোগী নারীকে বিয়ে করতে বাধ্য করার মাধ্যমে বিষয়টির মীমাংসা করা হয়। তবে এই আইনি ব্যবস্থার আরেকটি বিতর্কিত দিকও রয়েছে। যদি দেখা যায় ভুক্তভোগী নারী প্রথমে পর্দা লঙ্ঘন করে বা কোনো পরপুরুষের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে অভিযুক্তের আস্তানায় প্রবেশ করেছিলেন, তবে শরিয়া আইন অনুসারে ওই নারীও দণ্ডনীয় অপরাধের আওতায় চলে আসেন। এছাড়া, সৌদি আরবে আইনে বৈবাহিক ধর্ষণের (ম্যারিটাল রেপ) জন্য কোনো শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। অন্যদিকে, নারীর কাছে কোনো পুরুষ ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হলে, সেই নারীর বিচার বা শাস্তির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। অসম সাজার উদাহরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, সৌদি আরবে অনেক সময় ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বললে উল্টো ভুক্তভোগী নারীকেই শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে ভুক্তভোগীর সাজা দ্বিগুণ করার নজিরও রয়েছে। এমনকি ভুক্তভোগীর পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীকেও হয়রানির শিকার হতে হয় এবং পেশাগত লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়। সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে ও স্থানীয় সংবাদসূত্রে বেশ কিছু অসম সাজার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে: ২০০৯ সালে সৌদি গেজেট-এর একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৩ বছর বয়সী এক অবিবাহিত নারী গণধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ভ্রূণটি গর্ভপাতের চেষ্টা করার অভিযোগে ব্যভিচারের দায়ে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ১০০ বেত্রাঘাতের আদেশ দেওয়া হয়। তার প্রসবের সময় পর্যন্ত চাবুক মারার প্রক্রিয়াটি স্থগিত রাখা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সৌদি ধর্মপ্রচারক তার পাঁচ বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাকে আট বছরের কারাদণ্ড, ৮০০ বেত্রাঘাত এবং ১০ লাখ রিয়াল জরিমানা করে। এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় দুই পাকিস্তানি নাগরিকের ঘটনায়, যাদের একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সরাসরি শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সৌদি আরব রাষ্ট্র। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বিচারকে ভারসাম্যহীন শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। কাতিফ ধর্ষণ মামলা সৌদি আরবের বিচারিক ইতিহাসে কাতিফ ধর্ষণ মামলা একটি বহুল আলোচিত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত ঘটনা। ২০০৬ সালে দেশটির কাতিফ এলাকায় এক শিয়া কিশোরী এবং তার পুরুষ সঙ্গীকে সাতজন সৌদি পুরুষ অপহরণ করে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। প্রাথমিকভাবে সৌদি শরিয়া আদালত অপরাধীদের ৮০ থেকে এক হাজার পর্যন্ত বেত্রাঘাত এবং তাদের মধ্যে চারজনকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেন। তবে একই সঙ্গে আদালত পার্ক করা গাড়িতে আত্মীয় নয় এমন একজন পরপুরুষের সঙ্গে একা থাকার অপরাধে দুই ভুক্তভোগীকেও ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৯০টি বেত্রাঘাতের সাজা শোনান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই রায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে আপিল আদালত অসন্তুষ্ট হয়ে ভুক্তভোগীদের সাজা দ্বিগুণ করে দেন। পরবর্তীতে এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে নারীদের প্রতি আচরণ ও সৌদি বিচার ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ তার বিশেষ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে দুই ভুক্তভোগীর জন্য সরকারি ক্ষমার আদেশ জারি করেন। যদিও রাজকীয় আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে, এই ক্ষমা কোনোভাবেই সৌদি বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব বা রায়ের অন্যায্যতা প্রকাশ করে না। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
