সুন্দরবন কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বনবিভাগের গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী তোফা শুরু হয়েছে। ঘটনার গেলে হত্যার প্রতিবাদে সোমবার (১৮ মে) বিকেলে বিক্ষুব্ধ বনজীবী ও স্থানীয়রা বনবিভাগের অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। হামলায় ৫ জন বনরক্ষী আহত হয়। মঙ্গলবার (১৯ মে) নিহত জেলের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন সরকারের প্রতিনিধি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা গ্রামে নিহত আমিনুর রহমানের বাড়িতে যান। তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরিবারকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেন এবং নিহতের পরিবারের দায়িত্ব নেন। এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন এবং সমবেদনা জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবনে জেলে নিহতের ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। সরকার নিহতের পরিবারের পাশে থাকবে এবং ঘটনার সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
নিহত আমিনুর রহমান পাঁচ সন্তান রেখে গেছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্বে পাশে থাকার আশ্বাস দেন নেতারা।
ড. মনিরুজ্জামান বলেন, বৈধ পাস নিয়ে জীবিকার তাগিদে বনে যাওয়া একজন অসহায় জেলের ওপর এভাবে গুলি চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিএনপি সবসময় এই পরিবারের পাশে থাকবে এবং নিহতের এতিম সন্তানদের সহায়তায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
অন্যদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিহতের বাড়িতে যান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধি দল। এসময় শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমান নিহতের পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৩ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন আমিনুরসহ চার জেলে। সোমবার সকাল ৭টার দিকে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিম তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আমিনুর রহমান গাজী।
এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার বিকেলে শত শত বনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা মরদেহ নিয়ে বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ও স্টেশন অফিসে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যান। একপর্যায়ে তারা অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও বনকর্মীদের মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা অফিসের আসবাবপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি কর্মীদের খুঁজে বের করে মারধর করে। এতে বনকর্মী তপন, মেজবাহ, ফারুক, এখলাছুর ও ফায়জুর আহত হন।
খবর পেয়ে বিজিবি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহত বনকর্মীদের উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, জেলে নিহতের ঘটনা এবং পরবর্তী হামলা-ভাঙচুরের পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এখনো কোনো পক্ষ লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম জানান, নিহত আমিনুর রহমানের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ বিকেলে গাবুরায় নিয়ে গিয়ে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। পুরো গাবুরা ইউনিয়নে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে।