ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ১৯ মে ২০২৬ ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শ্রমের হাটে বিক্রি হওয়ার অপেক্ষায় মানুষগুলো
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 19 May, 2026, 1:14 PM

শ্রমের হাটে  বিক্রি হওয়ার অপেক্ষায় মানুষগুলো

শ্রমের হাটে বিক্রি হওয়ার অপেক্ষায় মানুষগুলো

নাম তাঁর দারুন আলী। তবে এই নামে কেউ তাঁকে ডাকে না। যুবক বয়সে বাঁশি বাজানোর নেশা ছিল খুব। সেই থেকে নামই হয়ে গেছে বাঁশিওয়ালা।

দারুন আলী ওরফে বাঁশিওয়ালার সঙ্গে দেখা হয় গতকাল সোমবার ভোরে রাজধানীর ফকিরাপুল পানির ট্যাংক এলাকায়। কাজের খোঁজে শ্রমজীবী মানুষেরা প্রতিদিন যেখানে ভিড় জমান, সেই মানুষ বেচাকেনার হাটে।

দারুন আলী পেশায় নির্মাণশ্রমিক, বয়স ৬০ ছুঁয়েছে। তাঁর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন পেছন থেকে কেউ একজন বলে ওঠেন, ওই বাঁশি! যাইবা? কাম আছে একখান।মুখ ঘুরিয়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কী কাম? উত্তর এল, বিল্ডিংয়ের কাম। সাততলায়।

ওই লোকের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর খানিকটা ভেবে না করে দিলেন দারুন আলী। তিন ছেলে, স্ত্রীসহ পাঁচজনের পরিবার তাঁর, থাকেন শাহজাহানপুরে। ছেলেরা বয়সে বড় হলেও কাজে তেমন আগ্রহ নেই। যার ফল হচ্ছে এই বয়সেও পুরো সংসারের ভার তাঁকেই টানতে হয়। মাসে খরচ হয় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তাঁর প্রতিদিনের মজুরি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। তবে সব দিন কাজ জোটে না।

তাহলে কাজ পেয়েও যে না করে দিলেন? দারুন আলীর জবাব, সাততলা নির্মাণাধীন ভবনের বাইরের অংশে বাঁশ দিয়ে বানানো মাচার ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে। তাঁর ভাষায়, একটা বাঁশ ভাইঙ্গা গেলেই শ্যাষ। এই বয়সে ওই কাজ পারুম না।

যদি কাজ না পান, তাহলে কী হবে? মলিন হেসে দারুন আলী বলেন,ভাইগ্যে থাকলে হইবই।

এই প্রতিবেদক গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত ফকিরাপুল পানির ট্যাংক এলাকায় ছিলেন। ওই সময় পর্যন্ত দারুন আলী কাজ পাননি। পরে রাতে মুঠোফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, বেলা ১১টার (গতকাল সোমবার) দিকে কাজ পেয়েছেন, মজুরি ছিল এক হাজার টাকা।


অপেক্ষা, কখন বিক্রি হবেন

ফকিরাপুল পানির ট্যাংকের পাশের যে ফুটপাতে কথা হয় দারুন আলীর সঙ্গে সেখানে রোজ সকালে মানুষ বেচাকেনার হাট বসে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে শ্রম বিক্রি করতে আসেন। তাঁদের মধ্যে থাকেন কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি ও তাঁদের সহকারী। আরও আসেন মাটিকাটার শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যানচালকসহ নানা ধরনের শ্রমজীবী মানুষ।

গতকাল ভোর সাড়ে ছয়টায় ফকিরাপুলের পানির ট্যাংক এলাকায় হাতে গোনা কয়েকজন শ্রমিক ছিলেন। তবে সাতটা বাজতে না বাজতেই ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক জড়ো হন। কারও হাতে ঝুড়ি–কোদাল, কারও হাতে বালতি–রঙের ব্রাশ। সবাই অপেক্ষায় আছেন, আশায় আছেন—কে কখন বিক্রি হবেন।

কাজ পাওয়ার আশায় পানির ট্যাংক এলাকায় জড়ো হওয়া শ্রমজীবী মানুষদের মধ্যে আটজনের সঙ্গে কথা বলেছে । প্রত্যেকেই বলেছেন, কাজ কমে গেছে। সপ্তাহে কখনো কখনো তিন–চার দিনও বেকার থাকতে হয়।

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে কথা হয় জোগাল (রাজমিস্ত্রির সহকারী) হিসেবে কাজ করা মো. শাহীনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি যশোরে। কয়েক বছর ধরে পরিবার নিয়ে ঢাকার কমলাপুরে থাকেন। পরিবার বলতে স্ত্রী ও ছোট দুই ছেলেমেয়ে। ফকিরাপুল এলাকাতেই ফুটপাতে একটি ছোট টংদোকান ছিল তাঁর। সম্প্রতি পুলিশের বিশেষ অভিযানে সেটি উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখন ঝুড়ি–কোদাল হাতে কাজ খুঁজতে প্রতিদিন আসেন এই হাটে।


কথায়–কথায় শাহীন জানান, এই হাটে এলেই যে রোজ কাজ পাওয়া যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজ থাক না থাক, মাস গেলে ছয় হাজার টাকা ঘরভাড়া ঠিকই দিতে হয়। এসবের মধ্য দিয়ে সংসার কীভাবে চলছে জানতে চাইলে তাঁর মুখ মলিন হয়ে যায়। জবাব দেন, ভাই, খুব কষ্টে চলতাছি। পুলা–মাইয়া ছোট। কাজ–কাম নাই তো। সব দিন তো কাম হয় না।

গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত কাজ জোটেনি শাহীনের। পরে রাতে মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ভাগ্য সহায় ছিল না। কাজ পাননি তিনি।

সকাল সাড়ে আটটার দিকে একজন নিয়োগদাতাকে দেখা গেল চারজন শ্রমিককে নিয়ে রওনা দিতে। তখন অপেক্ষায় ছিলেন টাইলসমিস্ত্রি করিম মিয়া। তিনি বলেন, ঝড়বৃষ্টিতে এই রাস্তার উপ্রেই বইসা থাকন লাগে কামের লাগি। এরপর কামে গেলে মহাজনেরা এক কাপ চা–ও সাধে না।এমনে চলতেছে আমাগোর জীবন।

ঠকাতে চায়

বসে থাকা শ্রমিকদের বেশ কয়েকজন কাজ পেয়ে সকাল নয়টার মধ্যে পানির ট্যাংক এলাকা ছেড়ে যান। এর মধ্যেই নতুন করে অনেকে সেখানে এসে বসেছেন। তাঁদের একজন শহীদুর রহমান। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। শরীর অনেকটাই নুয়ে পড়েছে। সংসারের ভার সামলাতে এখনো নির্মাণশ্রমিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হয় তাঁকে। ঢাকাতে থাকেন একাই। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। ছেলেরা সেভাবে খোঁজ নেন না তাঁর।

বয়স হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ঠকাতে চায় বলে অভিযোগ করেন শহীদুর রহমান। বললেন, ৮০০ টাকার কাজ কেউ কেউ ৫০০–৬০০ টাকা দিয়ে করিয়ে নিতে চান। বলেন, ‘মাইনষে বলে, চাচা বয়স হইছে, তুমি কাম পারতা না।

ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। সড়কের পাশেই তখনো কাজ না পাওয়া শ্রমিকেরা বসে আছেন। কারও মুখ গোমড়া। কেউ কেউ আবার নিজেদের মধ্যে আড্ডায় মেতে আছেন। এই আড্ডায় পাওয়া গেল রংমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন, এমন একজনকে। বয়স ষাটের কাছাকাছি।

কথার একপর্যায়ে পুরো নাম জানতে চাইলে বললেন, বাবুই লেখেন। কাজ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে খুব একটা চিন্তা নেই তাঁর। শুধু বললেন, ‘কপালে যেডা আছে, সেডাই হইব।








পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status