|
জামিন হয়, মুক্তি মেলে না, মামলার চক্করে আইভী
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() জামিন হয়, মুক্তি মেলে না, মামলার চক্করে আইভী এই হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন ও গ্রেপ্তার দেখানোর চালচিত্র। যদিও ১২ মামলার মধ্যে ৭টির এজাহারে তাঁর নাম নেই। আইভীর আইনজীবীরা বলছেন, একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে আইভীর মুক্তির প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। সর্বশেষ দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে আইভীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ২৬ এপ্রিল এক আদেশে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলাগুলোর মধ্যে ৯টি হচ্ছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক হত্যা মামলা। দুটি হত্যাচেষ্টা মামলা। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব মামলা হয়। অপর মামলাটি হচ্ছে গত বছর তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা। আইভীকে গ্রেপ্তারের পর প্রথমে তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। এসব মামলায় অধস্তন আদালতে জামিন চেয়ে বিফল হওয়ার পর তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন। গত বছরের ৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ওই পাঁচ মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন করে। এরপর ১২ নভেম্বর চেম্বার আদালত হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। আবেদনগুলো এখনো আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। আইভী আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও তিনি গডফাদার শামীম ওসমানের সঙ্গে লড়াই করে ভোট করে জিতেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত তাঁকে একের পর এক মামলায় জড়ানো হয়েছে। আইভীর আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথম পাঁচ মামলায় যেদিন হাইকোর্ট আইভীর জামিন মঞ্জুর করেন, সেদিনই আরও পাঁচ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে পুলিশ। নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গত বছরের ১৮ নভেম্বর সেটা মঞ্জুর করেন। নতুন পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা। অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় করা মামলা। এসব মামলার এজাহারে আইভীর নাম নেই। এসব মামলায়ও অধস্তন আদালতে জামিন চেয়ে বিফল হন আইভী। পরে হাইকোর্টে যান। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট এই পাঁচ মামলায় তাঁকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। এরপর ৫ মার্চ চেম্বার আদালত শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। সেগুলোও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা। অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় করা মামলা। এসব মামলার এজাহারে আইভীর নাম নেই। আরও দুই মামলায় গ্রেপ্তার এদিকে আগের মামলাগুলোয় হাইকোর্টে জামিন মঞ্জুরের পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি হত্যা মামলায় আইভীকে গ্রেপ্তার দেখাতে আবেদন করে পুলিশ। এর মধ্যে ২ মার্চ একটি মামলায় এবং ১২ এপ্রিল অপর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। এই দুই মামলায়ও অধস্তন আদালত জামিন না দেওয়ায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন আইভী। গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট এই দুই মামলায় তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিনও স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করেছে, যা শুনানির অপেক্ষায়। এর মধ্যে ২ মার্চ একটি মামলায় এবং ১২ এপ্রিল অপর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। হয়রানি না করার নির্দেশ আদালতের এর আগে ওই দুই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন আইভী। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। রুলে শুধু হয়রানি ও অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে বারবার এবং মিথ্যা প্রকৃতির মামলায় আবেদনকারীকে জড়ানোর কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার না দেখাতে, গ্রেপ্তার ও হয়রানি না করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া আইভীকে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আইনসচিব, নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের মহাপরিদর্শক, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার এবং নারায়ণগঞ্জ সদর, সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) রিটে বিবাদী করা হয়েছে। তাঁদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া তাঁকে গ্রেপ্তার না দেখাতে, গ্রেপ্তার ও হয়রানি না করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া আইভীকে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ‘আমি আসামির নাম দিইনি’ আইভীর বিরুদ্ধে এজাহারনামীয় প্রথম পাঁচ মামলার বাদীদের মধ্যে তিনজনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। অপর দুই মামলার বাদীর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। যে তিনজনের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাঁরা গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাঁরা এজাহারে কারও নাম দেননি। আইভীসহ আসামিদের তাঁরা চেনেন না। তাঁদের দাবি, বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী ও থানার পুলিশ মামলার এজাহারে আসামিদের নাম দিয়েছে। প্রথমে আইভীকে যে পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, সেগুলোর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় করা তৈরি পোশাক কর্মী মিনারুল হত্যা মামলা রয়েছে। এই মামলার বাদী নিহত মিনারুলের ভাই নাজমুল হক। পেশায় তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীনগর এলাকায় মুজিব ফ্যাশনের সামনে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন পোশাক কর্মী মিনারুল। আন্দোলন পণ্ড করতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, শামীম ওসমানসহ ১৩২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৩০০ জনকে আসামি করে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন নাজমুল হক। এই মামলার এজাহারে আইভীর নাম ১২ নম্বরে রয়েছে। নাজমুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি কাউকে চিনি না। সেখানে কী হয়েছে, তা–ও জানি না। থানায় বিএনপির লোকজন ছিল, তারাই মামলায় আসামির নাম দিয়েছে।’ এজাহারে ১২ নম্বর আসামি আইভীকে চেনেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওনাকে তো সবাই চেনে। উনি ছিলেন কি না, আমি জানি না।’ আইভীর মামলার আইনজীবী আওলাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আইভীর বিরুদ্ধে মামলাগুলো ভিত্তিহীন, তিনি কোনোভাবেই জড়িত নন। তাঁকে প্রতিহিংসাবশত এই মামলাগুলোতে জড়ানো হয়েছে। ভাতার কার্ডের আশ্বাসে মামলা, দাবি বাদীর চাঁদ মিয়া হত্যাচেষ্টা মামলার বাদী চাঁদ মিয়ার সঙ্গেও মুঠোফোনে কথা হয় গণমাধ্যমে । তিনি বলেন, তিনি মামলার আসামি হিসেবে কারও নাম দেননি। তাঁকে ভাতার কার্ড ও টাকা দেওয়া হবে—এমন কথা বলে মামলা করানো হয়েছে। আইভীসহ মামলার আসামিদের তিনি চেনেন না। চাঁদ মিয়ার দাবি, তাঁদের এলাকার বিএনপি নেতাসহ কয়েকজন তাঁকে দিয়ে এই মামলা করিয়েছেন। কিন্তু পরে তিনি কোনো টাকাপয়সা পাননি। নিজের টাকা খরচ করে তাঁকে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না। অন্যদিকে নাদিম হত্যা মামলার বাদী নিহত নাদিমের বাবা দুলাল হোসেন এবং অটোরিকশাচালক তুহিন হত্যা মামলার বাদী আলেয়া আক্তারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, সম্পৃক্ততা না থাকলে বাদ তিন মামলার বাদীদের এমন ভাষ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী গণমাধ্যমকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ থাকলে তাঁদের কাছে আবেদন করলে নতুন আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হবে। কেউ আবেদন না করলেও তদন্তে সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে তাঁদের বাদ দেওয়া হবে। তদন্ত এখনো চলমান। তবে একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আইভীর ছোট বোন মিনু আহমেদ। তিনিগণমাধ্যমকে বলেন, ‘আইভী আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও তিনি গডফাদার শামীম ওসমানের সঙ্গে লড়াই করে ভোট করে জিতেছেন। দল–মতনির্বিশেষে নারায়ণগঞ্জের মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত তাঁকে গ্রেপ্তারের পর থেকে একের পর এক মামলায় জড়ানো হয়েছে অথচ কোনো ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই।’ আইভী ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনটি নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
