|
দেশে ৮৬ শতাংশ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() দেশে ৮৬ শতাংশ শিশু শারীরিক শাস্তির শিকার যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে, বাস্তবে এখনও শিক্ষক কর্তৃক মারধর ও অপমানের ঘটনা ঘটছে। শুধু বিদ্যালয় নয়, বাড়ি, কর্মক্ষেত্রসহ বিভিন্ন জায়গাতেও শিশুদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। শাস্তি: শিশু অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাস্তি শিশুদের মানবিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং এটি শিশু অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো—শাস্তি শিশুদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে শাস্তির কারণে শিশুরা ভয় পেয়ে সাময়িকভাবে আচরণ বদলায়, তবে কারণ না বোঝার কারণে সুযোগ পেলে আগের আচরণে ফিরে যায়। ফলে শেখানোর পদ্ধতি হিসেবে শাস্তি কার্যকর নয়। গবেষণা বলছে, শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং বয়সভিত্তিক সঠিক দিকনির্দেশনা—শাস্তি নয়। শারীরিক শাস্তির সংজ্ঞা ও বৈশ্বিক চিত্র শারীরিক শাস্তি বলতে এমন আচরণকে বোঝায় যেখানে ব্যথা বা অস্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে শারীরিক বল প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে নিষ্ঠুর ও অপমানজনক আচরণও অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ১৮ বছরের নিচের অর্ধেকের বেশি শিশু প্রতি বছর শারীরিক শাস্তির শিকার হয়। ৫৮টি দেশের তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে ১৭ শতাংশ শিশু গুরুতর ধরনের শাস্তি—যেমন মাথা, মুখ বা কানে আঘাত কিংবা বারবার মারধরের—শিকার হয়। শাস্তির ক্ষতিকর প্রভাব বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শাস্তির শিকার শিশুদের বিকাশ স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা সমবয়সীদের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমে যায়। শাস্তির ফলে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যা মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে আত্মমর্যাদা কমে যায় এবং উদ্বেগ, বিষণ্নতা, এমনকি ভবিষ্যতে অসামাজিক আচরণ বা মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শাস্তি পাওয়া শিশুরা বড় হয়ে নিজেরাও নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে—হয় নির্যাতনকারী, নয়তো নির্যাতনের শিকার হিসেবে। আইনগত ও সামাজিক বাস্তবতা বিশ্বের ৭০টি দেশ ইতোমধ্যে সবক্ষেত্রে শিশুদের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করেছে। তবে বাংলাদেশ এখনো সেই তালিকায় নেই। অনেক দেশে এখনো “শৃঙ্খলা”র নামে এই শাস্তিকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, যা শিশুদের সমান অধিকারের পরিপন্থী। সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ১৯৭৯ সালে সুইডেন বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে শিশুদের সব ধরনের শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সহায়ক কর্মসূচির মাধ্যমে সেখানে শাস্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। একইভাবে ফিনল্যান্ড, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, রোমানিয়া ও পোল্যান্ডেও আইনগত নিষেধাজ্ঞার পর শাস্তির ব্যবহার কমেছে। কেন শাস্তি দেওয়া হয় বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকদের ব্যক্তিগত বা পেশাগত চাপ, হতাশা ও সীমাবদ্ধতা থেকে শাস্তির ঘটনা ঘটে। তবে এসব পরিস্থিতি কোনোভাবেই শিশুদের মারধরের যৌক্তিকতা তৈরি করে না। করণীয়: কী বলছে গবেষণা বাংলাদেশে শিশুদের শারীরিক শাস্তি বন্ধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে— সবক্ষেত্রে শিশুদের শাস্তি নিষিদ্ধ করে নতুন আইন প্রণয়ন, আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার কঠোর প্রয়োগ ও মনিটরিং, অভিভাবক ও শিক্ষকদের ইতিবাচকভাবে শিশু প্রতিপালনের প্রশিক্ষণ এবং শিশুদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাস্তি বন্ধ করা গেলে তা শিশুদের বিকাশ, শিক্ষা ও সামগ্রিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, পাশাপাশি সমাজে সহিংসতা কমাতেও সহায়তা করবে। শিশুরা বয়সে ছোট হলেও তাদের মানবাধিকার কোনো অংশে কম নয়। তাই আইনগত নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সামাজিকভাবে শারীরিক শাস্তিকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
