ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ৪ বৈশাখ ১৪৩৩
আগামী বাজেটে সব ধরনের কর-ছাড় ও ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পরামর্শ আইএমএফের
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 16 April, 2026, 11:26 AM

আগামী বাজেটে সব ধরনের কর-ছাড় ও ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পরামর্শ আইএমএফের

আগামী বাজেটে সব ধরনের কর-ছাড় ও ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পরামর্শ আইএমএফের

আমদানি পর্যায়ে থাকা সম্পূরক শুল্ক কমানোর জন্যও চাপ দিচ্ছে সংস্থাটি।আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটিতে সরকার যে কর-ছাড় দিচ্ছে, তা আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের বাজেট থেকেই পুরোপুরি তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

এছাড়া আমদানি পর্যায়ে থাকা সম্পূরক শুল্ক কমানোর জন্যও চাপ দিচ্ছে সংস্থাটি।যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক ও বসন্তকালীন সভায় এ বিষয়ে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "চলমান সভায় আইএমএফ সব ধরনের ট্যাক্স এক্সপেনডিচার তুলে দিতে বলেছে।"এছাড়া ওয়াশিংটনে অবস্থান করা একজন প্রতিনিধিও নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টিবিএসকে বলেন, "আগামী বাজেটে ব্যাপকভাবে কর-ছাড় তুলে নিতে বলছে আইএমএফ।"

আইএমএফের বোর্ড সভায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের আরও এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে জানান, জ্বালানি আমদানির চাহিদা মেটাতে আইএমএফের কাছে যে অতিরিক্ত বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংস্থাটি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।তবে নতুন এই ঋণের পরিমাণ এবং শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তিনি জানান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে। বৈঠকে নতুন ঋণ পাওয়ার পাশাপাশি চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় বকেয়া কিস্তিসহ প্রায় ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার জুনের মধ্যে ছাড় করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, "সেখানে আইএমএফ মূল ঋণচুক্তির দুটি শর্ত বাস্তবায়নের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। শর্ত দুটি হলো—সব ধরনের কর-ছাড় সুবিধা বাতিল করে ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিম্ন আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা। এই দুটি শর্ত বাস্তবায়ন করলে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ঋণ ছাড় করবে সংস্থাটি।"

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আইএমএফ বাংলাদেশের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার কথা বলেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সংস্থাটিকে জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ধীরে ধীরে শতভাগ বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করা হবে।

গত ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া এই সভা ১৮ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানও উপস্থিত রয়েছেন।

ব্যাপক পরিসরে কর-ছাড় বহাল

বর্তমানে সরকার কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বেশিরভাগের ওপর ভ্যাট, কর ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক অব্যাহতি দিয়ে রেখেছে। কিছু পণ্যে আংশিক অব্যাহতিও রয়েছে।

এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক সেবায়ও অব্যাহতি রয়েছে। এর বাইরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মতো কিছু প্রয়োজনীয় সেবাতেও ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার ইপিজেড, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগকারীদের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটিতে ছাড় দিয়েছে। রপ্তানি খাতের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন সুবিধা।

রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতে এ আয়ের ওপর শতভাগ কর অব্যাহতি রয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার।

সরকারের নির্ধারিত যে স্ট্যান্ডার্ড ট্যাক্স বা ভ্যাট হার রয়েছে, সেখান থেকে যে পরিমাণ ছাড় দেওয়া হয়, তা-ই 'এক্সেম্পশন' বা ছাড় নামে পরিচিত।

এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটিতে ছাড়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬৬ লাখ কোটি টাকা। একই সময়ে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় ছিল ৩ দশমিক ২৫ লাখ কোটি টাকা।

২০২২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি ইতিমধ্যে ছাড় করা হয়েছে।

তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রগতি না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে এসে ঋণের কিস্তি স্থগিত করা হয়।

পরবর্তীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঋণের অর্থ ছাড় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর-ছাড় কমানো প্রয়োজন হলেও একেবারে তুলে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

তাদের মতে, আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী হঠাৎ করে সব অব্যাহতি তুলে দিলে সংশ্লিষ্ট খাতে করের চাপ বাড়বে। এতে ধনী-গরিব সবার ওপরই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, "আগামী বছরই সব এক্সেম্পশন তুলে নেওয়া যৌক্তিক হবে না। এতে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।"

তিনি বলেন, "সরকার সানসেট ক্লজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সুবিধা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করতে পারে, যা এনবিআর ইতোমধ্যে শুরু করেছে। তবে পুরো এক্সেম্পশন ব্যবস্থাকে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।"

তিনি আরও বলেন, "কিছু খাত দীর্ঘদিন ধরে এক্সেম্পশন ও ইনসেনটিভ পেয়ে আসছে। আবার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নিয়েছে—এগুলো অব্যাহত থাকা উচিত নয়।"

তার মতে, কর বা ভ্যাটের হার কমিয়ে এক্সেম্পশনকে আরও সুশৃঙ্খল করতে হবে।

সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করা জরুরি এবং এলডিসি উত্তরণের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণোদনা কাঠামো সংস্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, "পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে কর-ছাড় কমানো প্রয়োজন, বিশেষ করে পোল্ট্রি, মৎস্য, কৃষি ও রেমিট্যান্স খাতে।"

এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, "যার আয় আছে, তাকে কর দিতে হবে—না হলে নয়।"

হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিস বড়ুয়া সতর্ক করে বলেছেন, কর-ছাড় হঠাৎ তুলে দিলে অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগতে পারে।

তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "হঠাৎ করে কর-ছাড় তুলে দিলে তা তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তন পুঁজিবাজারকে অস্থিতিশীল করতে পারে, তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয়-চাপজনিত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে।"

তিনি আরও বলেন, "এতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে, বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং কর্পোরেট কমপ্লায়েন্সে ব্যাপক সংকট তৈরি হতে পারে।"

তার মতে, বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করেন। তাই কোনো ধরনের ট্রানজিশন পিরিয়ড বা রূপান্তরকাল ছাড়াই প্রণোদনা তুলে দিলে আর্থিক নীতির ওপর আস্থা কমে যেতে পারে।

তিনি বলেন, "এই সংস্কার বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে ও পূর্বানুমানযোগ্য রূপান্তর জরুরি। সরকারকে সব বিদ্যমান কর-ছাড় গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে এগুলো প্রকৃত কৌশলগত মূল্য দিচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।" 

"ভবিষ্যতে প্রতিটি কর-ছাড়কে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সূচকের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, নিয়মিত বার্ষিক পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে," যোগ করেন তিনি।

নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

অবশ্য অতীতের সরকারের মতো ঢালাও কর-ছাড়ের নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে বর্তমান সরকার। একই সঙ্গে পারফরম্যান্সভিত্তিক কর-প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

গত ২৯ মার্চ এনবিআরে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "উচ্চতর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ানো, কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, কর ফাঁকি ও জালিয়াতি কমানো এবং ঢালাও কর-ছাড় ও রিবেট থেকে সরে এসে পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রণোদনায় যাওয়ার মাধ্যমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে।"

এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, ৫৩টি ক্যাটাগরির অধীনে কয়েকশ পণ্য ও কাঁচামালে—যার বেশিরভাগই কৃষি ও খাদ্যপণ্য—ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। এছাড়া জীবনধারণের জন্য ৯টি মৌলিক সেবা, সমাজকল্যাণমূলক সেবা, সংস্কৃতি, আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট সেবা, পাঁচ ধরনের পরিবহন সেবা এবং ব্যক্তিগতসহ অন্যান্য সেবায় সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। বর্তমানে ভ্যাটের স্ট্যান্ডার্ড হার ১৫ শতাংশ।

এছাড়া ভ্যাট আইনের তৃতীয় তফসিলের আওতায় বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট প্রযোজ্য।

অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে বেশ কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক রয়েছে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিছু পণ্য ও সেবায় অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে এবং ভোক্তার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই শুল্ক কমিয়ে যৌক্তিক করার জন্যও আইএমএফের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status