ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৬ চৈত্র ১৪৩২
খার্গ দ্বীপ আসলে কী? কেন দখল করতে চান ট্রাম্প?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Monday, 30 March, 2026, 10:44 AM

খার্গ দ্বীপ আসলে কী? কেন দখল করতে চান ট্রাম্প?

খার্গ দ্বীপ আসলে কী? কেন দখল করতে চান ট্রাম্প?

ইরানের জ্বালানি তেলের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। এই নীতিকে তিনি ভেনেজুয়েলার ‘তেল রাজনীতির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।

মার্কিন প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই দ্বীপটি দখল বা অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য করা এবং দেশটির আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এই সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে খার্গ দ্বীপ ইরানের জন্য অপরিহার্য। দেশটির উৎপাদিত প্রায় সমস্ত অপরিশোধিত তেল সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে পাঠানো হয়, কারণ মূল ভূখণ্ডের উপকূলীয় এলাকা সুপারট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য অত্যন্ত অগভীর।

এক সময় ইরানের রাজতন্ত্র রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসনে পাঠানোর জন্য এই দ্বীপটিকে ব্যবহার করত। ওপর থেকে দেখলে এই পাথুরে দ্বীপটিকে বেশ উর্বর মনে হয়। গত বছর ইরান নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’-র একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে দেখা গেছে, পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোতে যা বিরল, সেই স্বাদু পানির ঝর্ণার পাশে তালগাছের বাগান।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৪০০ বছরের পুরোনো দেয়ালে খোদাই করা নকশা এবং পাথর কেটে বানানো সমাধি। এছাড়া সেখানে ১৮ শতকে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরি একটি দুর্গও রয়েছে।

১৯৫০-এর দশকে তেল স্থাপনা হিসেবে গড়ে ওঠা এই দ্বীপে বিশালাকার স্টোরেজ ট্যাঙ্ক এবং জেটি রয়েছে, যেখান থেকে মূলত চীনে তেল রপ্তানি করা হয়। এখানে অন্তত ৮ হাজার বাসিন্দা বাস করেন, যাদের অধিকাংশই তেল শ্রমিক। এখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় একে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ বলা হয়। তবে স্যাটেলাইট চিত্রে তেলের বিশাল সব স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, পাইপলাইনের জাল এবং বিশাল জেটি দেখা যায়, যেখান থেকে সুপারট্যাঙ্কারগুলো মূলত চীনে তেল নিয়ে যায়।

ট্রাম্প এই দ্বীপটিকে একটি ‘ছোট তেলের দ্বীপ’ এবং ‘অরক্ষিত’ হিসেবে বর্ণনা করলেও বিশেষজ্ঞরা একে ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা বলে অভিহিত করেছেন।

১৯৮৮ সাল থেকেই এই দ্বীপটির ওপর ট্রাম্পের নজর রয়েছে। সে সময় ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ইরান যদি মার্কিন সেনা বা জাহাজের ওপর হামলা করে, তবে ‘আমি খার্গ দ্বীপে অভিযান চালাতাম এবং এটি দখল করে নিতাম।’ ট্রাম্পের মতে, দ্বীপটি দখল করা হবে ইরানকে চাপে ফেলার একটি কার্যকর উপায়।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যদিও মার্কিন বাহিনী ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপার এবং উভচর আক্রমণকারী জাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ মোতায়েন করেছে, তবুও স্থল অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান এমেরি সতর্ক করেছেন, দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২০ মাইলের কম দূরত্বে অবস্থিত হওয়ায় এটি সহজেই ইরানি রকেট ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এছাড়া পারস্য উপসাগরের গভীরে অবস্থিত হওয়ায় মার্কিন রসদ সরবরাহের পথটিও সবসময় ঝুঁকির মুখে থাকবে।

বিবিসির সিকিউরিটি ব্রিফ-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাইকি কে বলেন, এই দ্বীপটি দখল করা হলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর আয়ের প্রধান উৎসটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে, যা তাদের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

স্কুল অব ওয়ার পডকাস্টের হোস্ট এবং সিবিএস-এর জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যারন ম্যাকলিন বিবিসিকে বলেন, দ্বীপটি দখলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো অভিযান আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও তা হবে বেশ চ্যালেঞ্জিং।

তবে কিছু বিশ্লেষক এই অভিযানের ব্যাপারে আশাবাদী। ভিলানোভা ইউনিভার্সিটির সামরিক ভূগোলের অধ্যাপক এবং সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফ্রান্সিস এ. গ্যালগানো বলেন, ‘আমার মতে, এই বাহিনী দ্বীপটি দখল করতে সক্ষম, বিশেষ করে আমাদের যে বিশাল আকাশ ও নৌ শক্তি ইতিমধ্যেই সেখানে মোতায়েন আছে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘যদি পরিকল্পনাটি হয় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতা, তবে খার্গ দ্বীপ দখল করা হবে এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এটি আমেরিকাকে আলোচনার টেবিলে বিশাল সুবিধা দেবে এবং জাহাজ চলাচলে ইরানি হামলা বন্ধ করতে একটি ‘লাঠি’ হিসেবে কাজ করবে।’

অপরদিকে পারস্য উপসাগরীয় একটি দেশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইরান এখনও ততটা দুর্বল হয়নি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই খার্গ দখল করে নেবে।’

তার মতে, প্রেসিডেন্ট হয়তো এটি ভাবছেন, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে এখনও সঠিক সময় এসেছে। ইরানের কাছে এমন সব অস্ত্র আছে যা মার্কিন দখলদার বাহিনীকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘শাসনব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখনো ভেঙে পড়েনি।’

তবে, খার্গ দ্বীপ দখলের কোনো অভিযান সম্ভবত হিতে বিপরীত হবে। এতে সামান্য কৌশলগত লাভের বিপরীতে বিশাল মূল্য চুকাতে হতে পারে, যা অন্য উপায়ে আরও কার্যকরভাবে অর্জন করা সম্ভব ছিল। প্রকৃতপক্ষে, খার্গ দ্বীপ দখল এবং সেখানে অবস্থান করা কোনো নির্ণায়ক বিজয় আনার চেয়ে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘায়িত করার সম্ভাবনাই বেশি।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের এমেরি জানান, খার্গ দ্বীপ মূল ভূখণ্ড থেকে ২০ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থিত, যা রকেট, গোলন্দাজ বাহিনী এবং ড্রোন হামলার আওতার মধ্যে। এছাড়া এটি পারস্য উপসাগরের কয়েকশ মাইল ভেতরে হওয়ায় মার্কিন বাহিনীর সেখানে পৌঁছাতে অন্তত এক দিন সময় লাগবে, যা ‘ইরানকে চারপাশের জলসীমায় মাইন বিছানো এবং প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ দেবে।’

তার মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি দখলও করে ফেলে, তবে সেটি ধরে রাখা হবে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জের। কারণ রসদ সরবরাহের পথটি সবসময় ড্রোন, মিসাইল এবং কামানের গোলার মুখে থাকবে। পরিশেষে তিনি মনে করেন, এটি হবে একটি চরম বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত যা এই যুদ্ধকে অনেক মাস ধরে দীর্ঘায়িত করবে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইরান ও তার মিত্ররা কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট করেছেন, তারা মার্কিন সেনার প্রতিটি গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আপস করবেন না।

রাশিয়ার পক্ষ থেকেও সতর্ক করা হয়েছে, যেন এই দখলের পরিকল্পনা কেবল হুমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, খার্গ দ্বীপ দখল করলে ইরান তীব্র পাল্টা আঘাত হানতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে। শেষ পর্যন্ত এই অভিযান কোনো নির্ণায়ক বিজয় আনার বদলে যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status