ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ৬ মে ২০২৬ ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩
রেইনবো নেশন দর্শন: পাহাড়ে সংঘাত নিরসনে তারেক রহমানের দূরদর্শী পরিকল্পনা
মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন
প্রকাশ: Friday, 3 October, 2025, 10:42 PM

রেইনবো নেশন দর্শন: পাহাড়ে সংঘাত নিরসনে তারেক রহমানের দূরদর্শী পরিকল্পনা

রেইনবো নেশন দর্শন: পাহাড়ে সংঘাত নিরসনে তারেক রহমানের দূরদর্শী পরিকল্পনা

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের ঘোর অন্ধকার ভেদ করে আলো ছড়াতে যে রাজনৈতিক দর্শন প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল, তাই আজ বিশ্বজুড়ে জাতীয় সংহতির এক অপরিহার্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। এই ধারণাটি, যা রেইনবো নেশন বা রংধনু জাতি নামে পরিচিত, এর উৎপত্তি মহাত্মা নেলসন ম্যান্ডেলা এবং আর্চবিশপ ডেসমন্ড টু-টু’র প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফসল। বর্ণবাদের অবসানের পর নতুন জাতীয়তাবাদ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই দর্শনটি অ-জাতিগত রাষ্ট্র, ঐক্য এবং সকলের সমতাকে মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না বরং দক্ষিণ আফ্রিকার পোস্ট-অ্যাপার্থাইড যুগের জাতীয় সংহতির এক প্রভাবশালী মিথ ও রূপক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। এই ঐতিহাসিক পটভূমিতেই বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। তিনি রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতে তার ঘোষিত ৩১ দফা দাবীর কর্মসূচিতে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এই  রেইনবো নেশন কনসেপ্টটি সংযুক্ত করেছেন। এই সংযোজন কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের (CHT) সংকটের সমাধান নয় বরং দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর গভীর ত্রুটি চিহ্নিত করে সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের এক বৃহত্তর দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করার নেতৃত্বমূলক প্রজ্ঞারই পরিচায়ক। যেখানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রায়শই 'জিরো-সাম' (zero-sum) দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত, ঠিক যেমনটা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষমতাসীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (ANC) অভ্যন্তরে দেখা যায়  যেখানে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা বা জাতিগত বিভেদ মেটানোর চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় সেখানে তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত জাতীয় পুনর্মিলন ও অন্তর্ভুক্তির উপর জোর দেয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার রেইনবো নেশন মডেলের সাফল্য এবং এর অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা উভয়ই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। এই মডেলের প্রথম ও প্রধান সাফল্য ছিল অহিংস উপায়ে ক্ষমতার হস্তান্তর এবং একটি অ-জাতিগত বহু-দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বর্ণবাদের অবসান । সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন   (TRC) । এই কমিশন সামরিক বা প্রশাসনিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ভুক্তভোগী ও অপরাধীদের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা ও অপরাধীদের ক্ষমা করার (আমনেস্টি) সুযোগ দিয়ে পুনর্মিলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। TRC প্রমাণ করে যে, স্থায়ী সংঘাত নিরসনে সামরিক শক্তি বা প্রশাসনিক জোরের চেয়ে ঐতিহাসিক অবিচারের স্বীকৃতি এবং পুনর্মিলন (Reconciliation) বহুগুণে শক্তিশালী। তবে, এই স্বপ্নীল ধারণার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে বর্ণবাদের অবসান ঘটলেও, বাস্তবে  রেইনবো নেশন অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। শ্বেত ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনৈতিক সুযোগ ও সম্পদের যে ব্যবধান বর্ণবাদ যুগের সৃষ্টি, তা আজও প্রকটভাবে বিদ্যমান। শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, দুর্বল জনসেবা বিতরণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের অসমতা দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারেনি । ফলে, বহু দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিকের কাছে প্রশ্ন উঠেছে যে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া কি সত্যিকারের সংঘাতের রূপান্তর সম্ভব হয়েছে?

জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শিতা এখানেই প্রতিফলিত হয় যে, তিনি কেবল রাজনৈতিক ঐক্যের ধারণা গ্রহণ করেননি বরং দক্ষিণ আফ্রিকার এই অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য এমন একটি মডেল প্রস্তাব করেছেন, যা কেবল সংস্কৃতি বা রাজনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি নয়, ভূমি ও সম্পদের ন্যায্য বন্টনকেও নিশ্চিত করবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের  সংঘাতের মূল কারণ যেহেতু ভূমি, তাই কেবল প্রতীকী ঐক্যের মাধ্যমে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়।

জনাব তারেক রহমান কর্তৃক প্রস্তাবিত রেইনবো নেশন  মডেল পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক সমাধান নয়, বরং এটি একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদানের অপরিহার্য আহ্বান। সামরিকীকরণ ও জিরো-সাম রাজনীতির ব্যর্থতাকে অস্বীকার করে, এই দর্শন পুনর্মিলন ও ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রীয় স্থানে স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতের গভীরতা বিবেচনা করে, এখানে দক্ষিণ আফ্রিকার TRC-এর আদলে একটি  সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ গঠন করা জরুরি। এই কমিশন শুধুমাত্র ভূমি বিরোধ নয়, বরং ঐতিহাসিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে মোকাবিলা করবে, যা সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে সবার মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে। ১৯৯৭ সালের চুক্তির ব্যর্থতা দেখিয়ে দেয় যে, ভূমি অধিকারের সুরক্ষা ছাড়া শান্তি অসম্ভব। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রেইনবো নেশন মডেল সেই সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেবে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম কে টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারের পথে চালিত করবে । একটি প্রকৃত   রেইনবো নেশন প্রতিষ্ঠা করতে হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে্র স্থানীয় সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার রক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে একটি জাতীয়তাবাদে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে তা হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ , যার মূলমন্ত্র হবে “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার”। 

রেইনবো মডেলের অর্থনৈতিক প্রতিজ্ঞা কেবল শান্তি নয় বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। বিগত সরকারগুলির উন্নয়ন নীতি পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি বরং এই নীতিগুলো সবসময়ই শাসক শ্রেণী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করেছে। উদাহরণস্বরূপ অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট ও পার্ক প্রতিষ্ঠা কেবল স্থানীয় জনগণের জীবিকা ও বাস্তুসংস্থানকে বিপন্ন করছে, যেখানে তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি উপেক্ষা করা হয়েছে। জনাব তারেক রহমানের দূরদর্শী ভিশন এই ভুলগুলো শুধরে নেবে। তার নেতৃত্বাধীন সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক মডেল নিশ্চিত করবে, যেখানে সকল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় উপজাতিয় সমাজের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান জানানো হবে। এই মডেল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো অর্থনৈতিক বিভেদের পুনরাবৃত্তি রোধ করবে । স্থিতিশীলতা, আইনি স্বচ্ছতা এবং ভূমি অধিকারের নিশ্চয়তা ফিরে এলে, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পথ সুগম হবে, যা কেবল কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল বাসিন্দার অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে। এই অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলকতাই হবে রেইনবো নেশন দর্শনের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের চাবিকাঠি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির অকার্যকরতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সংকীর্ণ রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা এবং প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাব এই সংকটের মূল কারণ। এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, ন্যায়বিচার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের এক সামগ্রিক কাঠামো, যা কেবল জনাব তারেক রহমানের মতো একজন দূরদর্শী নেতার নেতৃত্বেই সম্ভব। তিনি রেইনবো নেশন কনসেপ্টকে তাঁর ৩১ দফা কর্মসূচিতে যুক্ত করে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের  জন্য একটি সমাধান দেননি বরং বৃহত্তর জাতীয় সংহতি ও পুনর্মিলনের এক নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই দর্শন জাতি, ধর্ম ও ভাষা নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক এবং সার্বোজনীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখায়। তারেক রহমানের এই সাহসী ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখান না বরং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য সুদূরপ্রসারী কৌশল নির্ধারণে সক্ষম।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক,কলামিস্ট ও সদস্য, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
Email : msislam.sumon@gmail.com

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status