|
ভ্রমণ ভিসায় ভয়ংকর মানবপাচার
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() ভ্রমণ ভিসায় ভয়ংকর মানবপাচার আর দুই মাস জেল খেটে গত ৯ সেপ্টেম্বর খালি হাতেই বাড়ি ফেরেন জহিরুল শেখ। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘দালাল আমাকে দুই মাসের ভিজিট (ভ্রমণ) ভিসা দিয়েছিল। যার মেয়াদই ছিল জুলাই মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিরগিজস্তান যাওয়ার পর দালাল আমাকে কোনো কাজ দেয় না, কম্পানিতেও নেয় না। আমি কাজের কথা বললেই সে বলে কাজ নিয়ে ভাবা লাগবে না, সেটা আমরা দেখছি। এভাবে পাঁচ দিন চলে যায়। পাঁচ দিন পর আমাকে পুলিশে ধরে। পরে আমি দালালকে ফোন দিয়ে বললাম, আমাকে পুলিশে ধরেছে। বলে, আপনি বাড়িতে জানায়েন না, যা করার আমরা করব। আমি বললাম, এত বড় ঘটনা ঘটল আমি বাড়িতে জানাব না। যদি আরো বড় দুর্ঘটনা ঘটে। বলে, না আপনি বাড়িতে জানাইলে সমস্যা হইবো। পরে আমি বলছি, আমারে ভিসা করে দেন। নইলে তাড়াতাড়ি ছাড়ান এখান থেকে। বলে, সেটা আমরা দেখব। আপনার তো কোনো চিন্তার দরকার নেই। পরে এমন করতে করতে আমি দুই মাস জেল খাটছি। দুই মাস জেল খাটার পর ওই দেশের সরকার টিকিট দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।’ একই ভোগান্তির শিকার হন টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার আলমনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির হোসেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি রাজি হওয়ার পর ১৫ দিনের ভিসা দেয় দালাল। ভিসা দেওয়ার পর বিমানবন্দরে যাওয়ার পর আমাকে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেয়। পরে আমাকে ১০ দিন হোটেলে রাখল। এরপর কিরগিজস্তান যেতে পারি। কিরগিজস্তান যাওয়ার সাত দিন পর আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিরগিজস্তান যাওয়ার পর আমাকে বিমানবন্দর থেকে কেউ রিসিভ করেনি। পরে আমি এক কম্পানির ভেতর দেড় মাস ছিলাম। সেখান থেকে বের হতে পারিনি। পরে আরেক কম্পানিতে ঢুকলাম। সেখানেও বেতন দেয়নি। এরপর আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।’ মানবপাচারের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীরা বলছেন, কিরগিজস্তানসহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দুই মাসের ভ্রমণ ভিসা দিয়ে প্রবাসী কর্মীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় তাঁদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় সে দেশে যাওয়ার পর এক বছরের ভিসা দেওয়া হবে। কিন্তু দেশগুলোতে যাওয়া বেশির ভাগ কর্মী ভিসা আর পান না। এতে তাঁরা অবৈধ হয়ে গ্রেপ্তার হন এবং পরে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয় তাঁদের। ভুক্তভোগী কর্মীদের অভিযোগ, বাংলাদেশি দালালরা ভুয়া কাগজপাতি বের করে পাঁচ লাখ, সাত লাখ এমনকি আট লাখ টাকা নিয়ে এই কর্মীদের দেশগুলোতে পাঠিয়ে দেয়। অনেক কর্মীদের ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়েও নিয়ে যাওয়া হয়। অভিবাসন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দ্রুত এ ধরনের মানবপাচার বন্ধ করতে না পারলে শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ সরকারের জননিরাপত্তা বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৩১৮ জন মানবপাচার আইনে বিভিন্ন থানায় মামলা করেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৯১ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১১৬ জন ও মার্চে ১১১ জন মামলা করেন। মানবপাচারে তৈরি হচ্ছে নতুন রুট, বাড়ছে কৌশল : ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্য বলছে, মানবপাচারকারীরা এখন শুধু সাগরপথে নয়, ভিজিট ভিসা, কনফারেন্স ইনভাইটেশন, ওয়ার্ক পারমিট, এমনকি হজ ভিসাও ব্যবহার করছে। দুবাই-লিবিয়া হয়ে ইউরোপ, আবার দুবাই-সার্বিয়া-স্লোভেনিয়া হয়ে ইতালি কিংবা সৌদি আরব হয়ে রাশিয়া। ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, মানবপাচারকারীরা দুবাইতে বিউটি পার্লার বা রেস্টুরেন্টে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নিয়ে জোরপূর্বক ইচ্ছার বিরুদ্ধে ডান্সক্লাব ও যৌন ব্যবসায় বাংলাদেশি নারীদের বাধ্য করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশিরা সাইবার স্ক্যামে ভয়াবহ নির্মমতার শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে এখন বাংলাদেশিদের নেপাল ও কিরগিজস্তানসহ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়াও মানবপাচারকারীরা বর্তমানে আলজেরিয়া, মৌরিতানিয়া, তিউনিশিয়া, রাশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, সার্বিয়ার মতো দেশ ব্যবহার করছে। ভোগান্তিতে প্রবাসী কর্মীরা নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার কাইলাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা সোহেল মিয়া। চকোলেট ফ্যাক্টরিতে কাজ করার উদ্দেশ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে গত বছরের মার্চ মাসে কিরগিজস্তান যান তিনি। তবে এই খরচ করা পুরো টাকা তুলতে ব্যর্থ হন সোহেল মিয়া। উল্টো প্রতারণার শিকার হন তিনি। গণমাধ্যমকে সোহেল মিয়া বলেন, ‘কিরগিজস্তানে চকোলেট কম্পানিতে কাজ দেবে বলে আমাকে দালাল নিয়ে গেছে। কিন্তু নেওয়ার পর দেখি কোনো ফ্যাক্টরি নেই। নেওয়ার পর একটা হোটেলে রাখছে। রাখার পর গরু-মুরগির খাবার বানানোর কাজ দিয়েছে। এই কাজ দুই দিন করেই টাইলস ব্লকের কাজ শুরু করি। দুই মাস করার পরও বেতন দেয় না। পরে আমার সঙ্গে এক লোক ছিল সে বলে, সোহেল ভাই আপনি আমার এখানে কাজ করেন। পরে গার্মেন্টে কাজ করি। সেখানে এক বছর দুই মাস কাজ করি। তারপর গ্রেপ্তার হয়ে দেশে চলে আসি।’ একই ভোগান্তির কথা জানান রংপুর জেলার গংগাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইয়নিয়নের বাসিন্দা রাকিব মিয়া। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি ১৭ মাস আগে কিরগিজস্তান গিয়েছি। আমার চার লাখ টাকা লাগছে। আমাকে কম্পানির ভিসায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমাকে ট্যুরিস্ট ভিসায় নিয়ে গিয়েছিল। পরে মাসখানেকের মতো কোনো কাজকাম দেয়নি। পরে আরেক দালালরে ১২ হাজার টাকা দিয়ে গামেন্টসে কাজ নিই। সেখানে বছরখানেক কাজ করি। ৪০০ ডলার করে প্রতি মাসে পেতাম। আমার তো ভিসা ছিল না। বাংলাদেশ বিমানবন্দর থাকার সময় আমার ভিসার মেয়াদ ছিল দুই দিন। তখন তারা বলেছে, কিরগিজস্তান আসলেই ভিসা করে দেবে। কিন্তু দেয়নি। এরপর আমাদের অফিসে রেট দিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করে। পরে ক্যাম্পে মাসখানেক ছিলাম।’ মানবপাচার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘মানব পাচারের চক্রগুলো শুধু তো আমাদের দেশে সক্রিয় নয়, বোঝা যাচ্ছে, এদের একটা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক আছে। তার মধ্যে বাংলাদেশিও রয়েছে, অন্যান্য দেশের পাচারকারীচক্র রয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তার জন্য আন্তর্জাতিক কিছু প্রক্রিয়া লাগবে। যে দেশ বা যে প্রবেশ পথগুলো মানবপাচারে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে দেশের সরকারের সঙ্গে একটা সমঝোতা স্মারক করতে হবে। যে স্মারকের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ যৌথ সমন্বয়ে কাজ করবে। এর জন্য শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত দরকার যে আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’ |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
অল্প বৃষ্টিতে পানিতে সয়লাব খড়িয়া কাজিচর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র
বাঘাইছড়িতে বাঘাইহাট জোনের উদ্দ্যোগে বছরব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান
রেজাউর রহমান ফাহিম বনানী থানা কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত
বনশ্রী সোসাইটি নির্বাচন: এগিয়ে বাতেন-দুলাল পরিষদ, যুগ্ম শিক্ষা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে রাশেদ আকন
