|
'ডিসির উদ্যোগ নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছিল এক শিক্ষাবান্ধব প্ল্যাটফর্ম'
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() 'ডিসির উদ্যোগ নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠেছিল এক শিক্ষাবান্ধব প্ল্যাটফর্ম' জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভা পরিণত হয়েছে একটি অনন্য শিক্ষা-বান্ধব প্ল্যাটফর্মে, যেখানে প্রশাসনিক, একাডেমিক এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে উঠে এসেছে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা। জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শনিবার (৩১ মে) সকালে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল (সি আর) আবরার। সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান। আলোচনায় আরও যুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মনিনুর রশিদ এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির উপর জোর দিয়ে অধ্যাপক ড. আবরার বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন সংস্কার প্রয়োজন যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন পায়। সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য অতিরিক্ত নম্বর প্রদান বন্ধ করতে হবে। তিনি তরুণ প্রজন্মের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে 'নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী পদক্ষেপ' হিসেবে বর্ণনা করেন এবং শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করেন। শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার তার বক্ততায় বলেন, এ প্লাস এবং গোল্ডেন জিপিএ ইত্যাদিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৯০ ভাগ ফেল করে। এমনভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে ছাত্র যে মার্ক অর্জন করেছে তাই পাবে। রাষ্ট্র তাকে খয়রাতি কোনো মার্ক দিবে না। আমরা এই সস্তা জনপ্রিয়তা নেয়ার জন্য সেটা করবো না। অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার আরও বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে আমাদের তরুণ সমাজ। তারা আমাদেরকে নাগরিক হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছে। আমাদের যে নাগরিক অধিকার সেটা পুনপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে এই তরুণ সমাজ। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম জীবদ্দশায় প্রজা হিসেবেই মৃত্যু হবে। কিন্তু আবার নতুন করে নাগরিক হিসেবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছি সেটা জুলাইয়ে তরুণ প্রজন্ম এবং শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের কারণে হয়েছে। সে কারণে আমরা দায়বদ্ধ। উপদেষ্টা আরও বলেন, শিক্ষক যে সম্মানের দাবিদার যে মর্যাদার দাবীদার সেটাকে আমরা নিশ্চিত করবো। অনেক সময় পেনশন পেতে ঘুরতে হয় সেগুলো আমরা দেখবো। আপনাদের সাথে যেন মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা হয় সেই বিষয়গুলো নিশ্চিত করবো। এগুলো আমাদের দায়িত্ব। আমরা সমস্ত স্কুলকে ভালো স্কুলে পরিণত করতে চাই। পাশাপাশি ভালো স্কুলে ভর্তি হতে না পারলে অভিভাবক হতাশ হবেন সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্কুলগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই যেন ছাত্ররা স্কুলে যেতে আগ্রহী থাকে। ছাত্ররা যদি স্কুলে না যায় এটা উদ্বেগের বিষয়, শিক্ষা উপদেষ্টা আরো যোগ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়ের তার বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জ জেলার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে তুলনামূলক কম আগ্রহের জন্য অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমার কাছে যখন এই তালিকা আসে, তখন দেখি সেই দুর্গম পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার চেয়েও নারায়ণগঞ্জ জেলার শিক্ষকগন প্রশিক্ষণে কম উপস্থিত। দেশের বিভিন্ন জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে তিনি আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গরা এতদিন কোন বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন, আমি বুঝতে পারি না। বিভিন্ন জেলার একেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখেছি দুই তিনটি নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে। সেখানে নারায়ণগঞ্জ জেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো খুবই দুর্বল। নারায়ণগঞ্জ জেলার শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নয়নে যা যা করার তা তিনি করবেন বলে আশ্বাস দেন। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম স্কুল কলেজের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে বিড়ম্বনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, এই সমস্যা সমাধানে আমাদের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা দিতে হবে। ম্যানেজিং কমিটিতে আসলে যে মধু খাওয়ার সুযোগ থাকে, সেটা সরিয়ে দিতে হবে। শিক্ষা বিভাগের সচিব আরও বলেন, শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসির হাতে দিয়ে দিতে হবে। সেইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ জেলা প্রশাসকের হাতে দিয়ে দিন। তাহলে দেখবেন যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানায় দোকান-পাট কিংবা মার্কেট আছে, সেগুলো ছাড়া অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে আসার মতো আগ্রহী লোকই খুজে পাওয়া যাবে না। তিনি শিক্ষাক্ষাতে উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন। গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শহরের মত স্কাউটিং কার্যক্রম রাখার উপর গুরুত্ব আরোপ করে ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, আমি গ্রামে স্কুলে ছাত্র থাকার সময় মাথায় করে স্কুলের উন্নয়ন কাজে মাটি এনেছি। কিন্তু বিগত দিনে স্কাউটিংকে রাজনৈতিক কারনে একদম নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। যদিও স্কাউটিংয়ের মূল আদর্শই ছিল সেবা করা। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শিক্ষা মানব সভ্যতার বিকাশের অন্যতম উপাদান হলেও তা আজ সংকুচিত হয়ে পড়েছে কেবল জিপিএ-৫ অর্জন ও চাকরি পাওয়ার মধ্যে। কিন্তু ‘পাস’ করা আর ‘শিক্ষিত’ হওয়া এক কথা নয়। পাসের হার বাড়লেও গুণগত শিক্ষা বাড়ছে না। সন্তান কতটা মানসম্মতভাবে শিক্ষা অর্জন করছে, সে দিকেই এখন অভিভাবকদের নজর নেই— সবাই ব্যস্ত শুধু ভালো রেজাল্ট ও সার্টিফিকেট অর্জনের পেছনে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, অর্থের বিনিময়ে অর্জিত শিক্ষায় দেশপ্রেম, ভদ্রতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ আজ বিলুপ্তির পথে। তরুণ প্রজন্ম এখন কল্পনার জগতে বসবাস করছে। তারা কাকে অনুসরণ করবে, কাদের আদর্শে নিজের স্বপ্ন গড়বে, সেই পথনির্দেশনাও পাচ্ছে না। বাস্তবতা ও মানবিক গুণাবলী না শেখা।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
