তেহরানে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার ঘটনায় ইরান ইসরায়েলকে দায়ী করে দেশটিতে হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ইরানকে পিছু হটতে বলছে। ইরান এ আহ্বান প্রত্যাখান করলেও হামলার ইস্যুতে এখনও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি। এই হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হতে পারে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ইরান কি আদৌ হামলা করবে? নাকি হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে পিছিয়ে যাবে? বা এখনও কেন হামলা হচ্ছে না?
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, ‘এই সপ্তাহেই ইরান ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের আক্রমণ করতে পারে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ, ওই হামলা খুবই ভয়াবহ হতে পারে।’
ওই দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ইউরোপের চার দেশের নেতাদের একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আমরা ইরানের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, তারা যেন ইসরায়েলকে আক্রমণ না করে। এই ধরনের আক্রমণ হলে আঞ্চলিক সুরক্ষার বিভিন্ন দিকগুলো নিয়েও আমরা আলোচনা করেছি।’
ইরান যাতে আক্রমণ না করতে পারে সে জন্য মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি অনেকটাই বাড়িয়েছে আমেরিকা। গত রোববার পেন্টাগন জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান-সহ মার্কিন এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে বলেছেন। মার্কিন সাবমেরিন ইউএসএস জর্জিয়াও সেখানে যাচ্ছে। এই সাবমেরিনের সঙ্গে গাইডেড মিসাইল যুক্ত করা যায়।
গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরান হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে। শুধু ইরান থেকেই না, বলা হচ্ছে, এই হামলা হবে লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেন থেকেও। এসব দেশে ইরানের মিত্ররা হামলায় যুক্ত হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।
এ প্রসঙ্গে ইসরায়েলের তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক রাজ জিম্মট বলেন, আমি মনে করি ইসরায়েলকে হামলার অপেক্ষায় রেখে তারা (ইরান) সত্যিই উপভোগ করছে। এই অপেক্ষার কারণে একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক এবং মানসিক মূল্য দিতে হয়।
গাজায় যুদ্ধ চলাকালেই ইরান-ইসরায়েল মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা বেড়েছে। এখন এ উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহল থেকে ইরানকে প্রতিশ্রুত হামলা করা থেকে বিরত রাখার জোর চেষ্টা চলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ইসরায়েলে ইরানের ঘোষিত হামলা বিলম্বিত করতে দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একঝাঁক যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর তিন শীর্ষ উপদেষ্টাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছেন।
এদিকে রয়টার্সকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি ইরানের সিদ্ধান্ত বদল করতে পারে। নয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো হুমকি বা অনুরোধ ইরানকে বিরত রাখতে পারবে না।
সূত্র অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু যুদ্ধবিরতির দিকে এখনো দেশটি তাকিয়ে আছে। চুক্তির সম্ভাবনা ব্যর্থ হলে বা আরও বিলম্ব হলে ইরান সরাসরি ইসরায়েলে হামলা করবে। তাদের সঙ্গে হিজবুল্লাহ, হুতি, সিরিয়ার মিলিশিয়া, ইরাকে অবস্থানরত ইরানপন্থী যোদ্ধারাও যোগ দিতে পারে। ফলে ইসরায়েল এবার খুব সহজে পার পাবে না।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গাজা নিয়ে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে ইসরায়েলে সরাসরি হামলা চালাতে পারে ইরান। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আলোচনা বিলম্বিত করার চেষ্টা করা হলেও একই পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে হামলার ধরন সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে কাতারের দোহায় চলা বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছেন, তারা আবারও আগামী সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে বসবেন। তখন হয়তো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘আমরা চুক্তির অনেক, অনেক কাছাকাছি।’
প্রতিবেদন বলছে, দোহায় হওয়া বৈঠকে ওয়াশিংটন একটি নতুন প্রস্তাব পেশ করেছে। আগে দেওয়ার প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা নতুন প্রস্তাবের ওপর কাজ চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন। পশ্চিমাদের এই নতুন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে হামাস।
গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এর পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজায় হামাসকে ধ্বংস করার জন্য অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা ১২০০– এর মতো। ওই সময় ২৫১ জনকে জিম্মি করে হামাস। আর গাজায় নিহতের সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি। যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত বেশ কয়েক বার চেষ্টা হয়েছে যুদ্ধবিরতি নিয়ে স্থায়ী চুক্তির। মাঝে সাময়িক যুদ্ধবিরতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে কার্যত কোনো সমাধান আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি বড় দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেন এবং শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) ইসরায়েলে হামলা করতে চায়। তবে এতে ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে বলেও ইরানের শঙ্কা রয়েছে। আরেকটি কারণ হলো, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি। গত এপ্রিলে ইরান যখন ইসরায়েলে হামলা করে তখন মধ্যপ্রাচ্যে এমন সামরিক উপস্থিতি ছিল না।
ইসরায়েলের তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক রাজ জিম্মট বলেন, গাজা যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। তবে এটি তেহরানকে অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিকভাবে হামলার বিলম্বকে বৈধতা দিচ্ছে।
এই অবস্থায় ইরান কখন এবং কীভাবে ইসরায়েলের হামলা চালাবে তা এখনও রহস্যই থাকছে। তবে পরিস্থিতি যেমন দাঁড়িয়েছে, তেহরানের কাছে কোনও ভালো বিকল্প আছে বলে মনে হচ্ছে না।