ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ১৭ জুন ২০২৪ ২ আষাঢ় ১৪৩১
হঠাৎ কেন নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাড়ছে?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Tuesday, 4 June, 2024, 2:22 PM

হঠাৎ কেন নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাড়ছে?

হঠাৎ কেন নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাড়ছে?

দেশে একের পর এক নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটছে। পিটিয়ে, কুপিয়ে, আগুন দিয়ে, ধর্ষণ কিংবা যৌন নিপীড়নের পর নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড বেড়ে গেছে। সোমবারও চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইয়াবা কেনার টাকা না পেয়ে মাকে কুপিয়ে হত্যা করে ছেলে ওমর ফারুক। এসব ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠছে এমন সব রোমহর্ষক ঘটনা কেনইবা ঘটছে?

 অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন- সামাজিক অবক্ষয়, পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। আবার বিভিন্ন ঘটনায় সময়মতো ও সঠিক বিচার না হওয়াসহ পেশিশক্তি ব্যবহারও এসব ক্ষেত্রে দায়ী। এভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির হতে থাকলে সামনে আরো খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হবে। এখনই এসব ঘটনার রাস টানতে হবে।

চট্টগ্রামে মাকে কুপিয়ে মেরে ফেলল ছেলে:
চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীতে ইয়াবা কেনার টাকা না পেয়ে মা রিনা আক্তার চন্দনাকে কুপিয়ে হত্যা করেছেন ছেলে ওমর ফারুক। রোববার (২ মে) রাতে নগরের পাহাড়তলী থানার ভেলুয়ার দিঘী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত নিহত রিনা আক্তার চন্দনা কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার আকতার হোসেনের স্ত্রী। এ ঘটনায় ছেলে ওমর ফারুককে আটক করেছে পুলিশ।  চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার মঈনুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বগুড়ায় আবাসিক হোটেলে মা-ছেলেকে হত্যা:
বগুড়ায় একটি আবাসিক হোটেল থেকে এক নারীসহ তার ১১ মাস বয়সী ছেলের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের বনানী এলাকার শুভেচ্ছা আবাসিক হোটেলের একটি কক্ষ থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের স্বামীকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় দুটি ধারালো ছোরা জব্দ করা হয়েছে।

চাচাতো বোনকে ভালোবেসে ৪ টুকরো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র:
চাচাতো বোনকে ভালোবেসে বিয়ের পর দুর্বৃত্তদের প্রতিহিংসার শিকার হলেন ঢাকার প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ছাত্র ওমর ফারুক সৌরভ (২৪)। রোববার (২ জুন) ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সদর উপজেলার মনতলা ব্রিজের নিচে সুতিয়া নদীতে লাগেজভর্তি ঐ ছাত্রের চার টুকরো খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সৌরভ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাইগবাজ ইউনিয়নের তারাটি গ্রামের ইউসুফ আলী আকন্দের ছেলে। তিনি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির বিবিএ’র ছাত্র ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে ঢাকার উত্তরা এলাকায় বসবাস করতেন।

চড়ের প্রতিশোধ নিতে রিকশাচালককে হত্যা:
চট্টগ্রামে মোবাইল অ্যাপে লুডু খেলাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডার জেরে চড়ের প্রতিশোধ নিতে রেঞ্চের আঘাতে হত্যা করা হয় এক রিকশাচালককে। এ ঘটনায় আরেক রিকশাচালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার (১ জুন) নগরের বন্দর থানার ধুপপুল এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত রিকশাচালক মো. আরিফ (২৮) ভোলা জেলার তজুমুদ্দিন থানার দেওয়ানপুর গ্রামের ভুঁইয়া বাড়ির মৃত আবদুল পাটোয়ারীর ছেলে। তিনি নগরের বন্দর থানার মধ্যম হালিশহর এলাকার ধুপপুলে গনি মাজনের বাড়িতে ভাড়ায় থাকেন।

লোহাগড়ায় তিন‌দি‌নে তিন খুন, আতঙ্কে এলাকাবাসী:
নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। গত সপ্তাহে ৩ দিনের ব্যবধানে একজন সাবেক চেয়ারম্যানসহ তিনজন খুন হয়েছেন। খুনের ঘটনার পর স্থানীয় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চাঞ্চল্যকর এসব খুনের ঘটনার পর পুলিশের কোনো পদক্ষেপই সাধারণ মানুষজন আশ্বস্ত হতে পারছেন না।

গত ১০ মে লোহাগড়া বাজার থেকে শালিস বৈঠকে যাওয়ার পথে খুন হন উপজেলা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা ও মল্লিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শিকদার মোস্তফা কামাল (৫৯)।

গত ১১ মে রাতে উপজেলার চরমঙ্গলহাটা গ্রামের রিজিয়া বেগমকে রাতের বেলা দুবৃর্ত্তরা গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে যায়। গত ১২ মে রাত সাড়ে ৮টার দিকে লক্ষ্মীপাশা এলাকায় কলা ব্যবসায়ী মো. কাসেম খাঁনের বাড়ির দক্ষিণ পাশে সড়কে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা মো. ফয়সাল মুন্সী (২৫) নামের একজন ভ্যানচালককে ছুরিকাঘাতে খুন করে ভ্যান ও টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।

গত ৩১ মে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার কলাবাড়ীয়া গ্রামে পূর্বশত্রুতার জেরে আনিস শেখ (৩৫) নামে একজনকে খুন করা হয়। তিনি উপজেলার কলাবাড়ীয়া গ্রামের মুসারেফ শেখের ছেলে।

শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না:
শিশুরাও এখন পাশবিকতা, বর্বরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যৌন নির্যাতন, ধর্ষণের পর অবুঝ শিশুদের গলা টিপে মেরে ফেলা হচ্ছে। বিচারবহির্ভূত হামলার শিকার হয়ে পঙ্গুত্ব বা পোড়ার দহনে অনেকেই জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছেন। সামাজিক অপরাধ, সহিংসতা বা মানুষের মধ্যে ফুটে ওঠা নৃশংসতার চিত্র প্রায় সব জেলাতেই। একটি ঘটনার পরপরই আরেকটি ঘটনার জন্ম হচ্ছে। এতে আগের ঘটনাটি ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

যা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা:
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়, বেকারত্ব, অনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, অনলাইন প্রযুক্তির কু-প্রভাব, পর্নোগ্রাফির প্রসার, অনৈতিক জীবনযাপন, পাচার, বিরোধ-শত্রুতা, ব্যক্তি স্বার্থপরতা, লোভ, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমাগত হত্যাকাণ্ডের কারণ।

তারা আরো বলছেন, নৃশংস ঘটনাগুলোর যে কোনো একটি গণমাধ্যমে এলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে। এরপর তদন্ত, চার্জশিট, আদালতে কচ্ছপ গতিতে চলা বিচার কার্যক্রম, সাক্ষীর গরহাজিরের কারণে বছরের পর বছর ধরে ভুক্তভোগীরা বিড়ম্বনার শিকার হন। অনেক সময় ঘুষের কারণে মামলার রায় আসে আসামির পক্ষে বা তারা জামিনে বের হয়ে আবারও একই কাণ্ড ঘটায়।

এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নুরজাহান খাতুন বলেন, অপরাধ আগে ছিল না সেটা নয়, এখন হার বেড়ে গেছে। সামাজিক অবক্ষয় চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু যেভাবে অপরাধ বাড়ছে সে হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে শাস্তি হচ্ছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পুলিশের তদন্ত থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত বছরের পর বছর ঘুরে ভুক্তভোগীরা বিচার না পেলেও সহিংস অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ:
মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক ও অনলাইন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। পরিবার, কমিউনিটি অর্গানাইজেশন এখন আগের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। তাই অপরাধ প্রবণতাও বদলে গেছে। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে সব অপরাধীকে সমান চোখে দেখে বিচারের আওতায় আনা গেলে অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।

মানবাধিকার সংস্থা নাগরিক অধিকারের নির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট সাইমুল ইসলাম রাব্বী বলেন, সমাজে সবার মনে আতঙ্ক। রাষ্ট্রকে সর্বপ্রথম দ্রুততম বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিরোধ ত্বরান্বিত করতে হবে।

পুলিশ যা বলছে:
পুলিশ বলছে, অপরাধ দমনে তারা বরাবরই তৎপর। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, মানবিক বিপর্যয়ের কারণে বেশিরভাগ ঘটনা ঘটছে। কয়েক বছর আগেও এমনটি ছিল না। যেখানে সন্তানের জীবন রক্ষায় এবং নিরাপত্তায় মা-বাবা জীবন পর্যন্ত দিতে পিছপা হন না। সেখানে সেই মা-বাবার হাতেই শিশুরা খুন হচ্ছে।

� পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ �







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: [email protected]
কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status