|
১৭ লাখ শিক্ষার্থী কোথায় গেল?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ১৭ লাখ শিক্ষার্থী কোথায় গেল? কিন্তু এবার যারা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় বসতে পারছে, তাদের সংখ্যা ১৩ লাখ ৫৯ হাজারের সামান্য বেশি। অর্থাৎ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সাত বছরের শ্রেণি কার্যক্রমে প্রায় ১৭ লাখ বা ৫৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার স্বাভাবিক পথ থেকে ছিটকে পড়েছে। প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এভাবে ঝরে যাচ্ছে কৈশোর থেকে তারুণ্যে পৌঁছানোর নানা পর্যায়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুল-কলেজ পার হওয়ার আগেই ছেলেমেয়েদের ঝরে পড়ার দুটো বড় কারণ বাল্যবিয়ে আর পরিবারের দারিদ্র্য। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুনের পর্যবেক্ষণ বলছে, করোনাভাইরাস মহামারীর পর শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার আগের চেয়ে ‘অনেক বেড়েছে’। ”আমি গ্রামের অনেক স্কুলে দেখেছি, অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে আসছে না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে হয়ত ৫০ জন ছিল, অষ্টম শ্রেণিতে সেটা ৩০ এ নেমে গেছে।” তার ভাষায়, কোভিড ‘সাংঘাতিকভাবে’ ক্ষতি করে গেছে শিক্ষার। “ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার যে স্পৃহা ছিল, স্কুলে আসার প্রবণতা- সেটা কমে গেছে। কোভিডের পরে মাধ্যমিক পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি অনেক কমে গেছে।” শাপলা ভাবতেও পারেনি ২০১৫ সালে প্রাথমিক শেষ করা সাড়ে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৬৯ জন অষ্টম শেষ করে ২০১৮ সালে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করে ২২ লাখ ৩০ হাজার ৮২৯ জন। তাদেরই একজন সুনামগঞ্জের সোনাপুরের শাপলা আক্তার। দুই সমাপনী শেষ করা শাপলা তখন ভাবতেও পারেনি, দশম শ্রেণিতে উঠেই তার শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাবে, হার মানতে হবে দারিদ্র্যের কাছে। শাপলার মা সোনা মালা বিবি জানান, স্বামী মারা যাওয়ায় দুই মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের বাড়িতে উঠতে হয় তাকে। শাপলাকে বিয়ে দেওয়া হয়। মেয়ের পড় চালিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না তার। ”ইতানের বাপ নাই। কুনো রুজগার নাই। খাতা-কলমইতো জুগাড় করতে পারি না। পড়বে কি?” ঢাকার সাভারের দক্ষিণ দরিয়ারপুরের সজীব ইসলাম এসএসসিতে এ গ্রেড পেলেও অর্থনৈতিক সংকটে এখন তাকে নির্মাণ শ্রমিক হতে হয়েছে। সজীব বলছিলেন, “দুই ভাই একসাথে পড়ছিলাম। অনেক দূর যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। বড় চাকরি করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যখন দেখলাম দুই ভাইয়ের খরচে কুলাচ্ছে না, তখন ছেড়ে দিতে হল।” শাপলা-সজীবের মত লাখো শিক্ষার্থী প্রতি বছরই স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়ছে। ২০১৭ সালে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনীর জন্য আবেদন করেছিল ৩০ লাখ ৯৬ হাজার ৭৫ জন শিক্ষার্থী। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেয় ২৯ লাখ ৫০ হাজার ৬১৫ জন। তাদের মধ্যে ২৮ লাখ ২ হাজার ৭১৫ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছিল। ওই বছর প্রাথমিক সমাপনী দেওয়া শিক্ষার্থীদেরই এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত ২০ লাখ ৪১ হাজার ৪৫০ জন শিক্ষার্থী এ বছর এসএসসি ও সমমানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ জন। অর্থাৎ আরও ৪ লাখ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে ব্যর্থ হয়েছে। সংকট কোথায়? সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারের সোনাপুর মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক এমদাদুল হকের পর্যবেক্ষণ, তার স্কুলে প্রতি বছরই ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণিতে ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। অষ্টম শ্রেণিতে ঝরে যাচ্ছে ১০ শতাংশের মত শিক্ষার্থী। এই শিক্ষক মনে করেন, মহামারীর সময়টা যে ধাক্কা দিয়ে গেছে, তার জের এখনো চলছে। ”দুই বছর শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার বাইরে ছিল, এ গ্যাপটা আগামী দশ বছরে পূরণ হবে কিনা সন্দেহ আছে।” এমদাদুল হক বলেন, এখন পড়ালেখায় তেমন খরচ না হলেও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ ছাড়া করছে। “আর্থিক সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ছেলেরা সংসার চালানোর জন্য পড়ালেখা ছেড়ে দিচ্ছে। বাবা-মায়েরা মনে করে, ছেলে-মেয়েরা ইনকাম করলে সংসার চালাতে সুবিধা হবে।” বাল্যবিয়ে ও শিশু শ্রম বন্ধ করা না গেলে এবং অভিভাবকদের সচেতন করা সম্ভব না হলে এভাবে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকানো যাবে না বলে মনে করছেন এই শিক্ষক। নেত্রকোণার দুর্গাপুরের বাকলজোড়া নয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারুক আহাম্মেদ জানান, তার স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে ১৫০ জন। ১০০ জন শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পিছনে দারিদ্র্যকেই মূল কারণ মনে করছেন এই শিক্ষক। “আমাদের এলাকাটা প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা। বেশিরভাগ অভিভাবক দরিদ্র। বাচ্চারা যখন অষ্টম, নবম শ্রেণিতে ওঠে, তখন বাবা-মায়েরা সংসারের খরচ যোগাতে মেয়েদের গার্মেন্টসে দিয়ে দেয়, ছেলেদের কাজে দিয়ে দেয়।” ফারুক আহাম্মেদ বলেন, কোভিডে অভিভাবকদের আর্থিক সক্ষমতা হারানো এবং দীর্ঘসময় পড়াশুনার বাইরে থেকে শিক্ষার্থীদের কাজে জড়িয়ে পড়ার কারণে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। স্কুলের পক্ষ থেকে অনিয়মিত হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ‘দরকার গভীর অনুসন্ধান’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, প্রাথমিকের পর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত ৫০-৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়ছে, তা নিয়ে গবেষণা করাটা সরকারের দায়িত্ব। “প্রাথমিকে ঝরে পড়াদের নিয়ে প্রকল্প আছে, সেটার কিছু সফলতাও আছে। কিন্তু সেকেন্ডারিতে তেমনভাবে কাজ হচ্ছে না। ঝরে পড়াদের ফিরিয়ে আনতে চাইলে বড় ধরনের গবেষণা করে সঠিক কারণটা জানা না গেলে কোনো উদ্যোগই ভালো ফল বয়ে আনবে না।” তিনি এর পেছনে মেয়েদের বাল্যবিয়ে এবং ছেলেদের শ্রমবাজারে ঝুঁকে পড়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন। এর সঙ্গে রয়েছে মাদকাসক্তি। নিজের গবেষণার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক হাফিজ বলেন, “আমি দেখলাম, যখন বিভিন্ন এলাকায় ইকোনোমিক জোন ডেভেলপ করছিল, তখন ওই এলাকাগুলায় নবম-দশম শ্রেণির অনেক বাচ্চা ড্রপ আউট হয়েছে।” এই শিক্ষক বলছেন, এসব সমস্যার মধ্যেও তার গবেষণায় বড় হয়ে ধরা পড়েছে শিক্ষকদের দুর্বলতা ও স্কুলের শিক্ষাদান পদ্ধতির গলদ। যে কারণে শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখা যাচ্ছে না। “প্রাথমিকের শিক্ষকরা মাধ্যমিকের শিক্ষকদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি ট্রেইনড। মাধ্যমিকের শিক্ষকরা গতানুগতিকভাবে পড়াটা শেষ করিয়ে দেন। স্কুলে শিক্ষার্থীকে ধরে রাখার জন্য যে রকমভাবে পড়ানো দরকার, সেটা আমরা গবেষণাতে তেমন পাইনি। “শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পড়ার সঙ্গে জীবনের মিল খুঁজে পায় না। ক্লাসে যা পড়ছে, তা জীবনে চলার পথে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকা রাখছে কিনা সে বিষয়ে শিক্ষকরা শিক্ষা দিতে পারছেন না। শিক্ষকরা কনটেন্ট পড়াচ্ছেন, কিন্তু কনটেক্সটের সাথে তেমন রিলেট করতে পারছেন না।” মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ফাহিমা খাতুন বলছেন, প্রতিটি স্কুলের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে ফিরিয়ে আনা দরকার। “আমরা যদি তাদের ফিরিয়ে আনতে না পারি, তাহলে এটা অনেক সমস্যা তৈরি করবে। সরকারকে মনিটরিং বাড়াতে হবে। ঝরে পড়াদের বিষয়ে জোর দিয়ে কাজ করতে হবে।” মাউশি কী বলছে? মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ শতাংশের বেশি নয়। মহামারীর পরে অধিদপ্তরের চালানো একটি জরিপ থেকে ওই হিসাব পাওয়ার কথা বললেন অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন শাখার পরিচালক অধ্যাপক আমির হোসেন। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে আমরা কোভিডের সময় যে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছি, ৯৩ ভাগ শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়েছে। এটা থেকে আমরা বলতে পারি, ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এখনো আছে, ঝরে পড়েনি।” আর সবাই সেই অর্থে ঝরে পড়ে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “অনেক ছেলেমেয়ে ডিপ্লোমা বা নার্সিংয়ে চলে যায়। আমাদের একটা বিরাট অংশ কারিগরিতে চলে যাচ্ছে। একেবারে ঝরে যাচ্ছে, এটা কিন্তু বলা যাচ্ছে না।” ঝরে পড়াদের ফিরিয়ে আনতে ‘মোটিভেশনাল কার্যক্রম ও গবেষণা’ চলছে বলেও জানান মাউশির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “যারা পিছিয়ে যাচ্ছে, তাদের জন্য আমরা এক্সট্রা ক্লাসের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছি। যাতে তাদের ঘাটতিটা ক্লাসেই পূরণ করতে পারে। আশা করি, অচিরেই আমরা পদক্ষেপ নিতে পারব। আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি।” -বিডি নিউজ
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
