ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১৫ মে ২০২৬ ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অঞ্জন কখনো দিনমজুর, কখনো ডেলিভারি বয়
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Thursday, 19 May, 2022, 11:54 AM

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অঞ্জন কখনো দিনমজুর, কখনো ডেলিভারি বয়

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অঞ্জন কখনো দিনমজুর, কখনো ডেলিভারি বয়

টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অঞ্জন ভূমিজ। ভূমিজদের মধ্যে তিনিই প্রথম যিনি চা বাগানের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।

মৌলভীবাজার জেলার জুড়ি উপজেলার ফুলতলার চা বাগানের শ্রমিক মা রতনমনি ভূমিজ, বাবা অমৃত ভূমিজ সন্তান অঞ্জন ভূমিজের বেড়ে ওঠা এলবিনটিলা চা পল্লিতে। ৩ ভাই-বোনের মধ্যে অঞ্জন সবার বড়। ছোট বোন অঞ্জলী পড়ছেন এশিয়ান ইউনিভারসিটি ফর উইমেন-এ। অন্যজন এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে।

অঞ্জন বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিষয়টি এক সময় স্বপ্নের মতো মনে হতো। ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেক ভয় হয়েছিল। এতটাই আতঙ্কিত ছিলাম যে, কিছু প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়েছিল।'

স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরে ভীষণ আনন্দিত অঞ্জন। বললেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষে এসে ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, অন্ধকার দিনের শেষে আলো দেখছি। খুব ভালো লাগছে।'

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অঞ্জন কখনো দিনমজুর, কখনো ডেলিভারি বয়

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অঞ্জন কখনো দিনমজুর, কখনো ডেলিভারি বয়


শৈশবের কথা মনে করে তিনি বলেন, 'ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি আমাদের চা বাগানের সব পরিবার দরিদ্র। শিক্ষিতের হার খুবই কম। গ্রামের কারো আর্থিক অবস্থা ভালো না। আর্থিক সংকটের কারণে ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে দ্রুত ঝরে পড়ে। এটা দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। চা বাগানের কেউ পড়ালেখার জন্য উৎসাহ দিতেন না।'

বাবা বলতেন "পড়াশোনা করে কী লাভ। চা শ্রমিকের সন্তান চা বাগানেই কলম কাটবি" এসব কথা এক সময় কষ্ট দিলেও এখন আমি সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছি।'

'ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হব। গরিব হওয়াটা পথের বাধা হয়ে দাঁড়ায়।'

জন্মের পর থেকে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের একজন অঞ্জন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথাও কখনো ভাবেননি। পড়ালেখার প্রতি ছোটবেলা থেকে অদম্য ইচ্ছা থাকলে তাকে কী আর পড়ালেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়।

অঞ্জন বলেন, 'আর্থিক অনটনের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করছি। ছুটিতে বেশি করে কাজ করতাম। বাবার সামর্থ্য খুব একটা না থাকায় পরিবারের অনেক দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি মায়ের সঙ্গে খাসিয়া পুঞ্জিতে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করি।'

'ঈদ-পূজাসহ অন্যান্য ছুটিতে আমি পুঞ্জিতে কাজ করে পড়ার খরচ যুগিয়েছি,' উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'পুঞ্জিতে কাজ করার সময় আমি সব রকমের কাজ করি। করোনা মহামারির সময় আমার ভার্সিটির ফিস যোগাড় করতে পুঞ্জির মানুষের পোষা প্রাণীদের খাওয়ানোর জন্য পাহাড় থেকে কচু এনে দিতাম। এতে মজুরির সঙ্গে ৫০ টাকা বেশি পেতাম।'

'মহামারির পুরো সময় পুঞ্জিতে কাজ করেছি। সকালে যেতাম সন্ধায় আসতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ কমানোর আশায় ছুটি পেলেই বাড়িতে এসে পুঞ্জির কাজে চলে যেতাম। আয় দিয়েই আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মেটাচ্ছি। করোনার প্রকোপ কমার পরও টিউশনি পাচ্ছি না।'

তিনি জানান, তার বাবাকে টাকার কথা বললে তিনি গরু বিক্রি করে বা মহাজন বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তাকে দেন। 'তারপর তিনি ঋণের বোঝা টানতে থাকেন। তাকে যেন এমনটি করতে না হয় সে জন্য আমি সবসময় কাজ খুঁজি।'

'বাড়িতে গেলেই কারো ধান কেটে দিই, কোদাল দিয়ে মাটি কাটি, ধান রোপন করি। কাজ না পেলে পুঞ্জিতে চলে যাই। তখন কিছু আয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলে রুমে রুমে খাবার ডেলিভারি দিই। প্রতিদিন ১০০ টাকা পাই।'

অঞ্জনের চোখে স্বপ্ন। আজ সে স্বপ্ন তার নিজেকে ছাড়িয়ে নিজ সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। ভবিষ্যত পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'চা বাগানের সংস্কৃতি আমাকে অনেক বেশি টানে। আমি আমার সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য-ইতিহাস সবাইকে জানাতে চাই।'

'দেশে ভূমিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে অঞ্জনই প্রথম যিনি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন,' উল্লেখ করে বাংলাদেশ ভূমিজ ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কৃষাণ ভূমিজ প্রতিবেদককে বলেন, 'তাকে দেখে আমরা উৎসাহিত হই। তার কঠোর পরিশ্রম আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আশা করছি, তিনি ভূমিজ শিশুদের পড়ালেখায় অবদান রাখবেন।'


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status