স্বামীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলা জীবন শিরোনামে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ভালোবাসার সেই দম্পত্তির বাড়িতে উপহার সামগ্রী নিয়ে হাজির হন ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান। এর আগে সেই দম্পত্তির সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসন।
জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করা সোহেল চাকরি করতেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। একদিন টেবিলের ড্রয়ারে রাখা একটা ১০ টাকার নোটে নম্বর পেয়ে ময়মনসিংহ ত্রিশাল উপজেলার গুজিয়াম গ্রামের রওশন আক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয়।
পরিচয় ভালোলাগা ভালোবাসা থেকে তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার। কিন্তু রওশন আরা প্রতিবন্ধী থাকায় সোহেলের পরিবার মেনে নেয়নি। পরিবারের অমতেই ২০০৭ সালে ডিসেম্বরে বিয়ে করে প্রতিবন্ধী রওশন আরাকে। স্ত্রীকে নিজের পিঠে করেই শুরু তাদের সংসার। ২০১০ সালে স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে স্ত্রীর সেবা করার জন্য চাকরি ছেড়ে চলে আসেন শ্বশুর বাড়ি গুজিয়াম গ্রামে। এখানে একটি ছোট টং দোকান দিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যেই নিজের সংসার আর স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এরই মধ্যে তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় এক কন্যা। চাকরি ছেড়ে স্ত্রী সন্তানকে ভালো রাখতে সোহেল মিয়া স্থানীয় মিলের শ্রমিক রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাত। ২০২০ সালে সে স্ট্রোক করে আর কোনো কাজ করতে পারে না। বাড়ির সামনেই টং দোকান দিয়েই চলে তাদের ভালোবাসার সংসার।
১৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসককে সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে অবহিত করার নির্দেশ দিলে বুধবার বিকেলে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান হাজির হন সেই ভালোবাসার দম্পত্তির কাছে। এ সময় তিনি ফুল মিষ্টি ও ছোট মেয়ের হাতে চকলেট তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের খোঁজখবর নিয়েছে জেনে কৃতজ্ঞতা জানান রওশন দম্পত্তি।
রওশন আরা বলেন, 'আমি পঙ্গু বলে সমাজে আমার কোনো দাম নেই। আমার ভাইয়েরাও আমাকে অবহেলা করে। কিন্তু আমার স্বামী আমি পঙ্গু হওয়ার পর আমাকে বিয়ে করে ১৪ বছর যাবৎ সংসার করছে। এক মুহূর্তের জন্য আমাকে কষ্ট দেয়নি। কখনো কোথাও যেতে চাইলে আমি শুধু বলি আর সে তার পিঠে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া-আসা করে। আমার মনের চাহিদা পূরণের জন্য সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে। তাকে আমি ধন-সম্পদ কিছুই দিতে পারিনি, শুধু আমার ভালোবাসাটুকুই দিয়েছি। আর সে আমার ভালোবাসা নিয়েই এখনো আমার সাথে আছে। আমরা সুখেই আছি। আমি চলাচল করতে পারি না কাজ করতে পারি না বলে সে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার সঙ্গে খেয়ে না খেয়ে আমার সেবা করে যাচ্ছে। আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার খোঁজ নিয়েছেন। ইউএনও মহোদয় বলেছেন আমাকে ঘরবাড়ি সব করে দেবেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।
সোহেল মিয়া বলেন, শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম থাকলেও তার ভেতরে আমার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি আজ পর্যন্ত পাইনি। তাকে বিয়ে করার কারণে আমার পরিবার আমাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে। একজন স্বাভাবিক মেয়ে স্বামীর জন্য যতটুকু না করতে পারে সে তার চেয়েও বেশি কিছু করার চেষ্টা করে আমার জন্য। তার মূল গুণটাই হচ্ছে যে সে পুরোপুরি আমার ভক্ত। সে আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না আর আমিও তার প্রতি পুরোপুরি দুর্বল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমাকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, ভালোবাসার দম্পত্তির সংবাদ দেখার পর আমার নিজের কাছে অনেক ভালো লেগেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে উপহার সামগ্রী নিয়ে তাঁদের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আজ দুপুরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরেজমিনে সার্বিক খোঁজখবর নিয়ে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আজ বিকেলে গিয়েছিলাম সেই বাড়িতে। তাদের সমস্যা শুনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যেই সেই ভালোবাসার দম্পত্তির সমস্যা সমাধান করে দেওয়া হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। সোহেল-রওশন দম্পত্তির ভালোবাসা আমাদের সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত।