শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, 2০২1
লেখা:মো. মোসাদ্দেকুর রহমান, জাপান
Published : Wednesday, 8 September, 2021 at 1:33 PM

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে: কিছু বাস্তবতা, কিছু সীমাবদ্ধতা প্রায় ১৮ মাস পর খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জনচাহিদা, বাস্তবতার বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে সরকার। এটি সময়োপযোগী হয়েছে কি না, তা অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে খোলা যেত, আরও আগে খোলা যেত কি না—এসব আলোচনা আসলে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যহীন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চেয়ে বর্তমানে সিলেবাস নিয়ে আলোচনা করাটাই বেশি জরুরি। এ আলোচনা হয়তো আরও অনেক আগেই শুরু করার প্রয়োজন ছিল।

বেশির ভাগ পাঠকই একমত হবেন যে গত ১৮ মাসে শিক্ষার্থীরা তাদের সিলেবাসের কোনো অংশই ঠিকমতো শেষ করতে পারেনি। অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্ভব নয়। ধরুন, গত বছর মার্চে যে শিক্ষার্থী নবম শ্রেণিতে পড়ত, সে বর্তমানে খাতা–কলমে দশম শ্রেণি প্রায় শেষ করে এসএসসি পরীক্ষার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কথা যদি বলি, বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান বা পদার্থবিজ্ঞানের কি বিক্রিয়া বা সূত্র বা শ্রেণিবিন্যাস বা জীবনচক্র তারা পড়ল বা জানল, কতটুকুই–বা বুঝতে পারল, এগুলো না জেনে উচ্চমাধ্যমিকে প্রমোশন নেওয়া বা পাওয়া অনেকটা সাহারা মরুভূমিতে কাউকে একা ছেড়ে দেওয়ার মতোই। একইভাবে যারা এখন এইচএসসির প্রস্তুতি নিচ্ছে বা নেবে, তাদের কথাটা একবার ভাবুন। সময়ের তুলনায় এই পর্যায়ের সিলেবাস এমনিতেই অনেক বড় এবং অতীব জরুরি। ভর্তি পরীক্ষা, এমনকি দেখা যায় যে অনার্সের অনেক বিষয়ের অনেক কোর্সের একটি বড় অংশজুড়েই থাকে এইচএসসির বিভিন্ন বিষয়ের বিশদ বিবরণ, যার প্রাথমিক ধারণা না থাকলে অতল জলে হাবুডুবু খাওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি করবে।

অন্যান্য লেভেলেও একই মাত্রায় না হলেও তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা-গ্যাপ হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার তো বটেই, জাতীয় জীবনেও এটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের আলোচনা অবশ্য ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, যা একটি ভালো দিক। অনেকেই শিক্ষাবর্ষ তিন-চার মাস বাড়িয়ে দিতে বলেছেন। তবে আমার মনে হয়, সেটি কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা না করাই ভালো। এই শিক্ষার্থীরাই একদিন দেশের হাল ধরবে, শিক্ষক-চিকিৎসক-বিজ্ঞানী-আমলা-প্রকৌশলী হবে। শিক্ষায় ঘাটতি নিয়ে তাদের সেটি করতে দিলে ক্ষতি দেশেরই হবে। আমার মনে হয়, সম্ভব হলে পুরো ১৮ মাসই ফিরিয়ে দেওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের। প্রয়োজনে এসব শিক্ষার্থীর চাকরিতে প্রবেশ ও অবসরে যাওয়ার বয়সও দুই বছর করে বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। তবে ন্যূনতম এক বছর শিক্ষাবর্ষ প্রলম্বিত না করলেই নয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ আছেন, তাঁরা মত দেবেন, নীতিনির্ধারকেরা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে সেই সিদ্ধান্ত যেন কোনোমতে এ অবস্থা থেকে পার হয়ে যাওয়ার জন্য না হয়, সেটিই আমাদের সবার কাম্য হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে করোনা সংক্রমণ বাড়বে এবং অনেক শিক্ষার্থী আক্রান্ত হবে—এটা নিশ্চিত করেই ধারণা করা যায়। বিশেষ করে ডেলটা ধরন খুবই সংক্রামক। যদিও বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়েই সফলভাবে ডেলটা ধরন মোকাবিলা করছে, তবু ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে যে একটি বিশাল সমন্বয়হীনতা ও সীমাবদ্ধতা আছে, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। যেহেতু জাপানে আছি, এখানকার কয়েকটি উদাহরণ দিতে চাই। গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় এ দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সাপ্তাহিক গড় ছিল এক হাজারের কাছাকাছি। জুলাইয়ের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের প্রথম পর্যন্ত সে গড় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজারের কাছাকাছি। এখন আক্রান্তের ৯০ ভাগই ডেলটা ধরনের। গত মার্চে (ডেলটা ধরন শনাক্তের আগে) যেখানে ১৯ বছরের নিচে সংক্রমণের হার ছিল মোট শনাক্তের ৮ দশমিক ২ শতাংশ, গত আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এখন প্রায় প্রতিদিনই ১০ বছরের নিচের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। তারপরও সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়নি। যদিও অভিভাবকদের সবার মধ্যেই ভয় ও অস্বস্তি কিছুটা রয়েছে, কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম চলছেই। এ ক্ষেত্রে সরকারের সার্বিক যে নীতি ও দিকনির্দেশনা আছে, সেগুলো একটু উল্লেখ করব। যেমন যদি কোনো একটি স্কুলের একজন শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হয়, তবে সে ক্লাসের সব শিক্ষার্থী তিন থেকে সাত দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসবে না এবং সবারই করোনা পরীক্ষা করা হবে। সেই শিক্ষার্থী যদি প্রতিষ্ঠানের অনেকের সঙ্গে মিশে থাকে, তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধান পুরো প্রতিষ্ঠান তিন দিনের জন্য বন্ধ করতে পারেন এবং সব কন্ট্যাক্ট শনাক্ত করে এর মধ্যেই তাদেরও করোনা পরীক্ষা করতে হবে। আর আক্রান্ত শিক্ষার্থী বা শিক্ষক ১৪ দিন প্রতিষ্ঠানে আসবেন না। সরকার আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য হাসপাতালে বেড নিশ্চিত করবে। তবে এলাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনে চলতে থাকবে। সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র‌্যাপিড করোনা টেস্টের কিট পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তবে সেটি সমাপ্ত হতে আরও অনেক সময় লাগবে।

আমি যে এলাকায় থাকি, এখানে আটটি প্রি-স্কুল, পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারটি জুনিয়র হাইস্কুল ও দুটি হাইস্কুল (কলেজ) রয়েছে। এখানে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে গত মাস পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী আক্রান্ত না হলেও গত দেড় সপ্তাহে প্রায় চারজন আক্রান্ত হয়েছে। কমপক্ষে দুজন শিক্ষকও আক্রান্ত হয়েছেন। ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তিন দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যারা আক্রান্তদের সংস্পর্শে ছিল, তাদের সবার পিসিআর টেস্ট করা হচ্ছে। তবে অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু আছে, যদিও মধ্যাহ্নবিরতি বাতিল করা হয়েছে, যেন এক ক্লাসের শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থী মিশতে না পারে। তারপরও চারদিকে একটা অস্বস্তি, একটা সীমাবদ্ধতা খুব ভালোভাবেই টের পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু জাতি হিসেবে জাপানিজরা একতাবদ্ধ, সরকার দায়িত্বশীল এবং জবাবদিহিমূলক, তাই এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতেও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষা পেয়ে যাচ্ছে। তবে আমাদের দেশে যেখানে আমরা নিয়ম মানার ক্ষেত্রে বা বলতে গেলে কোনো ক্ষেত্রেই একতাবদ্ধ নই, সরকারে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি—দুটোরই যথেষ্ট অভাব রয়েছে, সেখানে একটি সম্ভাব্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা প্রস্তুত আছেন তো?
লেখক: ড. মো. মোসাদ্দেকুর রহমান, পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো, কাগোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, এবিনো শিক্ষা বোর্ড, জাপান।


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, বাড়ি ৭/১, রোড ১, পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft