পদক জিতলেই ভারতীয়, নইলে চাইনিজ করোনা: ক্ষোভ প্রকাশ অঙ্কিতার
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Friday, 30 July, 2021, 4:43 PM
পদক জিতলেই ভারতীয়, নইলে চাইনিজ করোনা: ক্ষোভ প্রকাশ অঙ্কিতার
টোকিও অলিম্পিকে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন মনিপুরের ইম্ফলের মীরাবাঈ চানু। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই বাসিন্দা ভারোত্তোলন ইভেন্টে রৌপ্য জয় করেছেন। এতে ভারতবাসী অভিভূত হয়ে মীরাবাঈ চানুকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন। তবে মডেল তথা অভিনেতা মিলিন্দ সোমনের স্ত্রী অঙ্কিতা কোনওয়ার মনে করেন, চানুর সাফল্যে খুশি হওয়া এক ধরনের কপটতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অঙ্কিতার অভিযোগ, মুখের গড়ন চীনের বাসিন্দাদের সঙ্গে মিল থাকায় উত্তর-পূর্ব ভারতীয়দের ভালো চোখে দেখেন না মধ্য ভারতীয়রা। মীরাবাঈ চানুর মতো অনেকেই বর্ণবৈষম্যের শিকার হন। বর্তমানে তাদের করোনা বলে কটাক্ষ করা হয়। কিন্তু এখন মীরাবাঈ চানুকে মাথায় তুলেছেন তারাই।
সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন যে, দেশের জন্য মেডেল জিতলে তবেই উত্তর-পূর্বের মানুষ 'প্রকৃত ভারতীয়' হয়ে ওঠেন, অথচ অন্য সময়ে তাদের ডাকা হয় চিঙ্কি, চাইনিজ, নেপালি আর এখন করোনা বলে পরিচয় দেওয়া হয়।
ওই পোস্টের পরে আলোচনা শুরু হয়েছে কেন নিজের দেশেই বর্ণবাদী বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন উত্তর-পূর্বের মানুষ।
জানা গেছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা, যারা পড়াশোনা বা কাজের সূত্রে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় থাকেন, তারা বলছেন যে নিয়মিতই রাস্তাঘাটে তাদের বর্ণবাদের শিকার যেমন হতে হয়, তেমনই কাজের জায়গাতেও তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরন করা হয় চেহারার জন্য।
মেঘালয়ের বাসিন্দা ফিলারিমা কলকাতায় থেকেছেন পড়াশোনার জন্য, যেমনটা থাকেন উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েক হাজার ছাত্র ছাত্রী। ওই অঞ্চলের আরও বহু মানুষ কলকাতায় কাজ করেন। গোটা দেশে সংখ্যাটা কয়েক লাখ।
ফিলারিমা এখন ফিরে গেছেন নিজের শহর মেঘালয়ের শিলঙে। সেখান থেকেই তিনি জানাচ্ছিলেন কলকাতায় থাকার সময়ে তাকে এবং তার মতো উত্তর-পূর্বের বাসিন্দাদের কীভাবে বর্ণবাদের শিকার হতে হয়েছে।
ফিলারিমার কথায়, কখনো আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে যে আমি ব্রুস লি-র দূরসম্পর্কের আত্মীয় কী-না, অথবা চীনা ভাষা বলতে পারি কী-না, আমার ব্ল্যাক বেল্ট আছে কীনা! এগুলো বলা হত এমনভাবে যেন আমি চীনা নাগরিক।
ফিলারিমা জানান, একদিন তো রাস্তায় চীনা চীনা বলে ডাকা হয়েছে, আর বলা হয়েছে আমি যেন নিজের দেশে ফিরে যাই। অথচ যারা এগুলো বলতো, তাদের অনেকেই জানত যে আমি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দা। তবুও খুব হাল্কা চালে এ ধরণের কথা শুনতে হত - এমনকি শিক্ষিত মানুষদের মুখ থেকেও।
উত্তর-পূর্বের বাসিন্দা, যারা অন্য প্রদেশে থাকেন, তাদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যাকে ওই অঞ্চলের বাইরে কোথাও কখনো অপমান হজম করতে হয়নি।
তাদেরকে কুরুচিকর নামে ডাকা, অশ্লীল কথা বলা, কখনও বা নেপালী, চীনা প্রভৃতি বলা - এসব সহ্য করতে হয়। আর সহ্যের সীমা যখন ছাড়িয়ে যায় - যেমন কয়েক বছর আগে দিল্লিতে উত্তর-পূর্বের একাধিক বাসিন্দাকে মারধর করা হয়, মুখে থুতুও ছেটানো হয় - তখন জোরেশোরে প্রতিবাদ হয়। তবেবেশিরভাগ সময়েই বাড়ি ফিরে চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছু করার থাকে না অনেকের।
যেমন বলছিলেন নাগাল্যান্ড থেকে কলকাতায় একটি নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কাজ করতে আসা এক নারী, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। তার কথায়, "আমি যদি কাজের ক্ষেত্রে খুব ভালও করতাম, তাহলেও কোম্পানির কর্মকর্তারা কোনও ধরণের প্রশংসা করতেন না। অথচ সেই একই কাজটা যদি কোনো বাঙালি সহকর্মী করতো, তাহলে সে কিন্তু প্রশংসা পেত টিম লিডারের কাছ থেকে।
এই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হত সম্ভবত তিনি উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে গিয়েছিলেন বলেই। ভারতের বেশিরভাগ মানুষের চেয়ে তাদের চেহারা ভিন্ন রকম - সেজন্যই এটা করা হত বলে তার ধারণা।
এই অপমানগুলো আমি বাঙালি সহকর্মীদের কাছে বলতেও পারতাম না। উত্তর-পূর্বের অন্য বন্ধুদের সঙ্গেই এসব নিয়ে কথা হতো, আর বাড়ি ফিরে চোখের জল ফেলতাম। তবে এখন আমি নাগাল্যান্ডে ফিরে এসেছি। নিজের গন্ডির মধ্যে আমি অনেক ভাল আছি, বলছিলেন নাম জানাতে না চাওয়া ওই নারী।
আসামের গুয়াহাটির সমাজকর্মী আঞ্জুমান আরা বেগম নিজে এ ধরণের আচরনের শিকার হননি, কারন তার চেহারায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছাপ নেই। তবে ভারতের বহু জায়গায় ভ্রমণ করার সময়ে তার যে ধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে, তারই কয়েকটা শোনাচ্ছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত মীরাবাঈ চানু ভারতীয় অ্যাথলেট। দেশটির মনিপুরের ইম্ফলের নংবক কাকচিং গ্রামে ১৯৯৪ সালের ৮ আগস্ট জন্ম তার। তার পরিবার বনে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করে। ভারি কাঠের বোঝা তুলেই শৈশব ও কৈশোর পার করেছেন তিনি।
২০২১ সালে ভারোত্তোলনে রুপা জিতেছেন। মনিপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের সাইখোম মীরাবাঈ চানুর হাত ধরে টোকিও অলিম্পিকে পদকের খাতা খুলল ভারত।