পণ্য আমদানির আড়ালে দেশ থেকে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। নির্ধারিত পণ্য আমদানির অনুমতির বিপরীতে আনা হচ্ছে অন্য কিছু। আর সেসব পণ্য কাস্টমস থেকে ছাড়াতে তৈরি করা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জাল নথি। এমনকি নকল করা হচ্ছে ওয়েবসাইটও।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমসে জব্দকৃত মালামাল ছাড়াতে এমন জালিয়াতি নজরে আসে কর্তৃপক্ষের এ ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা বিভাগ। সিআইডি সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। আর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পণ্য আমদানির আড়ালে বিদেশে টাকা পাচারের ঘটনা ধামাচাপা দিতে সরকারি নথিপত্র ও ওয়েবসাইট জাল করার কথা স্বীকার করে তারা।
চট্টগ্রাম সিআইডি’র দেওয়া তথ্যানুযায়ী জানা যায়, সরকারি নথি জাল ও ওয়েবসাইট নকলের অভিযোগে জড়িতদের ধরতে প্রথম অভিযানে গ্রেফতার করা হয় সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান খান এন্টারপ্রাইজের মালিক গোলাম মাওলা খানকে। পরবর্তীতে তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় ব্যবসায়ী অংশীদার গোলাম ফারুক খান এবং আবুল খায়ের পারভেজ নামে আরো দু'জনকে। এর মধ্যে আবুল খায়ের পারভেজ হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইট নকল করার মূলহোতা। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরণের আরো ৩-৪টি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করার কথা পারভেজ স্বীকার করেছে সিআইডির কাছে। আর এই সিন্ডিকেটে মন্ত্রণালয়ের নথি জাল করা রাসেল এবং রানা রয়ে গেছে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
চট্টগ্রাম সিআইডি’র বিশেষে পুলিশ সুপার শাহনেওয়াজ খালেদ বলেন, ওয়েবসাইট নকল করার কাজটি পারভেজ করে থাকে। ইতোপূর্বে রাসেল ও রানার অর্ডারে এমন ২-৩ টি ওয়েবসাইট নকলের কাজ করার কথা সে স্বীকার করেছে।
পণ্য আমদানির আড়ালে বিদেশে টাকা পাচারের হার আশঙ্কাজনক বাড়তে থাকায় সরকারি নথিপত্র জাল করার হার বাড়ছে বলে মনে করছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের অন্তত ১২টি ঘটনা উদঘাটন করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। এসব ঘটনায় পাচার হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এবার মানিলন্ডারিং মামলার সুপারিশ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ। পিনাট এবং অলিভের আড়ালে গুড়ো দুধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সিয়াম এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুল জলিলের বিরুদ্ধে'ও মানিলন্ডারিং মামলা করবে কাস্টমস।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার নূর-এ-হাসনা-সানজিদা অনুসূয়া বলেন, অভিযুক্তরা একই সঙ্গে তিনটি অপরাধ করেছে। প্রথমত ঘোষিত পণ্যের বাইরে পণ্য আমদানি করেছে। এরপর সে পণ্য ছাড়িয়ে নিতে তারা নথি জাল ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট পর্যন্ত নকল করেছে। একই সঙ্গে তারা যেসব পণ্য আমদানী করেছে সেগুলোও শর্তযুক্ত পণ্য।
এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিতে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা এবং সে সাথে সরকারি বিভিন্ন নথিপত্র জাল করায় ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, এ ধরনের ঘটনা কিভাবে তারা ঘটাচ্ছে তা গভীর ভাবে তদন্ত করতে হবে। আর এ ধরনের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন কাজ করার সাহস কেউ না পায়।
গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরে কম শুল্কের পিনাট এবং অলিভ আমদানির নামে উচ্চ শুল্কের গুড়ো দুধ আনার ঘটনা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ৭০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি জব্দকৃত মালামাল ছাড়িয়ে নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠি ও ওয়েবসাইট নকল করলে কাস্টমসের অনুসন্ধানে তা ধরা পড়ে যায়। পরে কাস্টমসের পক্ষ থেকে বন্দর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।