দুবাইয়ের তাপমাত্রা বুধবার ৪১ থেকে ৪৪ ডিগ্রিতে উঠা-নামা করছে। দুপুরের তপ্ত রৌদে ঘামে ভেজা শরীরে মানি এক্সেচেঞ্জে এসেছেন চট্টগ্রামের রুবেল হোসেন। আসন্ন ঈদে পরিবারের জন্য কিছু টাকা পাঠাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। সোনাপুর লেবার ক্যাম্প এলাকার বেসরকারি ওই মানি এক্সেচেঞ্জে তার মতো আরো অন্তত ২০ জন তখনও চারটি লাইনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। পরিবার-পরিজনের ঈদ প্রস্তুতিতে সামিল হতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা তাদের।
অন্যান্যবারের ঈদের মতো এবার মানি এক্সেচেঞ্জে তেমন ভিড় নেই। প্রবাসীদের চোখে-মুখে আছে বিষণ্ণতা। এবারের ঈদ ভিন্ন বার্তা বহন করছে। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে এদের কেউই পরিচিত নয়। করোনাভাইরাসের আর্বিভাবে সবকিছুই প্রবাসীদের প্রতিকূলে নিয়ে গেছে। কর্মহীন দিন পার করছে অসংখ্য প্রবাসী বাংলাদেশি।
লকডাউন শিথিলের পর যেই কজন কাজে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশের বেতন হয়নি এখনো। বন্ধ রয়েছে ছোট-বড় অনেক কোম্পানি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ঈদ এসে গেছে দুয়ারে। ঈদকে ঘিরে পারিবারিক চাহিদার কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে প্রবাসীদের। একদিকে চলছে নিজেদের উৎসবহীন ঈদ প্রস্তুতি, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবারের জন্য নূন্যতম টাকা পাঠানোর তাড়না।
এক্সেচেঞ্জ থেকে বের হয়ে রুবেল হোসেন বলেন, 'প্রতিবছর ঈদে যে পরিমাণ টাকা দেশে দিয়েছি এবার তার তিনভাগের একভাগে নেমে এসেছে। লকডাউনের পর দৈনিক হিসাবে যে কদিন কাজ করেছি তার পুরো টাকাটাই দেশে পাঠালাম।' নিজের ঈদ প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এবার শতকরা ৫জন প্রবাসীও নিজের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে পারছে না। অনেকে এখনো কাজে যেতে পারেনি। খেয়ে-না খেয়েও রোজা পালন করছে কেউ কেউ। এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে কখনো ভাবিনি।'
একই দৃশ্য দেখা গেল দুবাইয়ের ড্রাগনমার্টের আল আনসারি এক্সেচেঞ্জের সামনে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে দেশে টাকা পাঠাতে ৮-১০ জন প্রবাসী লাইন ধরে আছেন। তাদের একজন সিলেটের আবদুল কাইয়ুম। তার মুখেও শোনা হলো একই কথা। কাইয়ুম বললেন, 'আমরা এখানে কেমন আছি সেটি কেউ দেখছে না। কিন্তু পরিবার কষ্টে থাকলে তা সবাই দেখবে। করোনায় আয় কমে গেছে, আগের মতো কাজ নেই। রুম ভাড়া আর খাবারের খরচ জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর এসেছে ঈদ। এমন সময় পরিবারের জন্য যতটুকু সম্ভব দিতেই হচ্ছে।'
সংযুক্ত আরব আমিরাতে সর্বপ্রথম করোনা শনাক্ত হয় চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি। ১১২ দিনের ব্যবধানে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। লকডাউন শিথিল করে দিলেও বন্ধ রয়েছে স্বাভাবিক বিমান চলাচল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোম্পানির কার্যক্রম।
তবে বুধবার থেকে নতুন করে জীবাণুনাশক স্প্রে'র কর্মসূচির ঘোষণা এসেছে সরকার। রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ঘরের বাইরে না যেতে নাগরিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে ঈদ আড্ডা বা জনসমাগমের ওপরেও। আইন অমান্য করলে রাখা হয়েছে জরিমানার বিধান। এমন অবস্থায় প্রবাসীদের ঈদ মোটেও আনন্দের হবে না তা আঁচ করা যাচ্ছে।
প্রবাসী পরিবারগুলোর প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কমিউনিটি নেতা প্রকৌশলী নওশের আলী বলেন, 'প্রবাসীরা অনেকটাই অসহায় এখন। নিজেরা কর্মহীন, বেতনহীন। পরিবারের খরচ পাঠানো অনেকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এই সময় সরকার যদি প্রতি প্রবাসীর পরিবারে নগদ অর্থসহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করে, তাতে হয়ত কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।'