পুঁজিবাজারের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে, মনে হচ্ছে না এখানে সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী চলছে। এমন কথাই জানালেন পুঁজিবাজার ও বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ।
পুঁজিবাজারে লাগাতার দরপতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংককে চাপ দিয়ে শেয়ার বিক্রি বন্ধে বহু চেষ্টা হয়েছে। তবে তাতে কোনো কাজই হচ্ছে না। এতে করে বহু বিনিয়োগকারী পথে বসার উপক্রম। বুধবার (২৪) জুলাই পুঁজিবাজারের সূচকে মিশ্রপ্রিতিক্রিয়া দেখা গেছে সকাল থেকে। কখনও বড় ধরনের উত্থান আবার কখনও বা হঠাৎ করে পতন। দিন শেষে ০.০৪ পয়েন্ট কমে সূচক ৫০৭৭ পয়েন্টে।
গত ২৭ জানুয়ারি বাজার সূচক ৫৯৯২ পয়েন্টে ওঠার পর যে পতন শুরু হয়েছে, তা প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। এ সময়ে সূচক হারিয়েছে এক হাজারের বেশি পয়েন্ট। বাজার-সংশ্নিষ্টদের দাবি, ২০১০ সালের মতো সূচক গণনা করা হলে সূচকের বর্তমান অবস্থান ৩০০০ পয়েন্টের ওপরে নয়। গত ৬ মাসে পুঁজিবাজার ৪৮ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা মূলধন হারিয়েছে।
এদিকে, গত সোমবার (২২) জুলাই লেনদেন শেষে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা, যা গত ২৯ জানুয়ারির লেনদেন শেষে ছিল ৪ লাখ ২১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৬ মাসের ব্যবধানেই বাজার মূলধন উধাও হয়ে গেছে ৪৮ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এ সময় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৭.৩০ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৬৬ পয়েন্টে। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর ডিএসই’তে সূচক ছিল ৪৯৯৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ ৩৩ মাসের মধ্যে আজ সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বাজার। গত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ১৪ দিনই পতনের ধারায় রয়েছে পুজিঁবাজার।
এতে করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। মুনাফার স্বপ্ন তো দূরে থাক, লসেই শেয়ার বিক্রি করছেন। এক ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, লসের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, এই ভয়! যারা ঋণ করে শেয়ার কিনেছেন, তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ।
এরই মধ্যে রাস্তায় নেমে বিনিয়োগকারীরা উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) দায়ী করছেন। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলোর দাবি, সংস্থার চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন এবং তার নেতৃত্বাধীন সংস্থা বাজারের দরপতন ঠেকাতে ব্যর্থ। এ অবস্থায় তার পদত্যাগ বা অপসারণ দাবি করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা।
এদিকে, সিএনএ টেক্সটাইল গত মঙ্গলবার ২ দশমিক ৮ টাকায় নেমে এসেছে। ২০১৫ সালে তালিকাভুক্ত হয় সিএনএ টেক্সটাইল। শুরুর দিন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ছিল ২২ টাকা। মঙ্গলবার তা ২ টাকায় নেমে এসেছে।
দেশের অন্যতম ব্রোকারেজ হাউস গ্লোব এর মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, বহু কথা বলা যাবে না, কারণ সাগরে বসবাস করা কুমিরের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এ বিষয়ে বলতে হলে মোটা দাগে আমাকে একটি কথা সবার আগে বলতে হয়, ২০১০ সালের কারসাজির ঘটনায় সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি অর্থাৎ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের গড়া কমিটির সুপারিশ বাস্তবায় করা হলে এমন লাগামহীন পতনের ঘটনা ঘটতো না বলে আমি মনে করি। কি কারণে তার (ইব্রাহিম খালেদ) গঠিত কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন হল না, তা আপনারা খুঁজে বের করুন। জাতির বিবেক হিসেবে আপনাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে একটি কথা না বললেই নই, সকলে এখানে আসে শেয়ার ব্যবসা করতে, তাহলে তো লস হবেই। কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করবেন, কোম্পানি মুনাফা করবে, আপনাকে লাভ দিবে। আর যখনি আপনি শেয়ার বাজারে ব্যবসা শুরু করবেন অর্থাৎ বেঁচা-কেনার প্রতিযোগিতায় নামবেন, তখন আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হতে পারেন। সেটা আপনাকে মেনেও নিতে হবে। কারণ এটা ব্যবসা। লাভ-লস থাকাটাই স্বাভাবিক। কোন বড় বিনিয়োগকারী শুনেছেন কখনও লসে পড়েছে? লস করছে ক্ষুদ্রবিনিয়োগকারীরা। যারা প্রতিদিন লাভ করতে চাই। হুজুগে ক্রয় করে আর দিন শেষে লস করে। তারাই এই বাজারের ক্ষতি করছে।
এদিকে বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ২০১১ সালে ড. এম খায়রুল দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাজারকে কারসাজিমুক্ত করতে এবং শৃঙ্খলায় ফেরাতে ব্যর্থ হলে তিন মাসের মধ্যে পদত্যাগ করবেন তিনি। ২০০৯-১০ সালে যাদের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ ছিল, এমন কিছু ব্যক্তি ব্রোকারেজ হাউস কিনে মালিক বনে গেছেন। বর্তমান কমিশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি অতি সম্প্রতি কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ পদে বসার বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছেন। পূর্বের কোনো অনিয়ম ও কারসাজির ধারা বন্ধ হয়নি, উল্টো নতুন অনেক কারসাজির হোতার সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান কমিশনের সময় আইপিও এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত আট বছরে বর্তমান কমিশন ৯০টির অধিক কোম্পানির আইপিও অনুমোদন করেছে। এর সিংহভাগই মানহীন। উল্টো প্রভাবশালীদের পক্ষ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জকে তালিকাভুক্ত করে নিতে চাপ দিয়েছে বিএসইসি।
তালিকাভুক্তির পর মানহীন কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষ নিজেরা এবং প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় শেয়ারের ক্রেতারা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা লুটে নিয়েছে। এমন বেশ কিছু কোম্পানি এখন বন্ধ, মালিকদের হদিস নেই। কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ থাকলেও শেয়ারগুলো এখনও লেনদেন হচ্ছে। স্টক এক্সচেঞ্জ এসব কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করতে চাইলেও বাদ সেধেছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। মালিকপক্ষের গোপন শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ করতে পারেনি।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের একজন নাজমা আরা বেগম জানান, বিএসইসি চেয়ারম্যান কোন যোগ্যতার বলে একটি রাষ্ট্রের অন্যতম আর্থিক খাত পুঁজিবাজারে মত গুরুত্বপূর্ণ একটি চেয়ারে প্রায় ৮ বছর যাবত বসে আছেন? কারণ আজও অজানা? অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর, এবং সর্বশেষ অর্থমন্ত্রীও বদল হয়েছে। অথচ খায়রুল সাহেবের যেন বদল নেই? এটাতো সাধারণ বিষয়, এক জায়গায় বেশি দিন থাকলে, যে কারও ক্ষেত্রে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠে, উনাকে (খায়রুল) ঘিরেও এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। অতএব তাকে পদচ্যুত ছাড়া শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে না।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেছেন, আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে পুঁজিবাজারে। সত্যি বলতে কি, পুঁজিবাজার এখন আর কারও নিয়ন্ত্রণে নেই। কোনো সূত্রই যেন মানছে না। স্বাভাবিক নিয়মে সূচক বাড়লে কারেকশন হবে। ঠিক তেমনই সূচক বা দর কমলে বিনিয়োগকারীরা সুযোগ নেবে কিন্তু পুঁজিবাজারে অব্যাহত বিক্রয় চাপ চলছে। সূচকও ৫ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে এসেছে। এটা এত বড় মার্কেটের জন্য খুবই চিন্তার বিষয়।