ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ● ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ● ৩ কার্তিক ১৪৩৩
সরবরাহ সংকটের জের: বিশ্বব্যাপী খাবারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Monday, 19 October, 2026, 9:29 PM

সরবরাহ সংকটের জের: বিশ্বব্যাপী খাবারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা

সরবরাহ সংকটের জের: বিশ্বব্যাপী খাবারের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা

ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তার এক পার্কিং কর্মী মুহাম্মদ ইয়াসিন বলেছেন, তিনি খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, কারণ লাগামহীন ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে মৌলিক খাদ্যপণ্যগুলো এখন তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

তিনি বলেন, তার এলাকায় খাবারের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আগে যে খাবার তিনি ৭,০০০-৮,০০০ রুপিয়ায় কিনতেন, এখন তা কিনতে ১৫,০০০ রুপিয়া লাগছে, অথচ তার সাপ্তাহিক আয় মাত্র ২০০,০০০ থেকে ৩০০,০০০ রুপিয়া।

বিশ্বব্যাপী খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগামী মাসগুলোতে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কারণ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে চলেছে, যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং এল নিনোর প্রভাবে খরায় শস্য উৎপাদন কমে গেছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতির ধারা আগামী মাসগুলোয় আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা চার সন্তানের জনক ইয়াসিনের মতো দুর্বল ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

ইন্দোনেশিয়ায় দেরি করে বৃষ্টি আসার পূর্বাভাসের মধ্যে চালের দাম এরই মধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে, মিশরে পাউরুটির দাম এক-চতুর্থাংশ বেড়েছে এবং ভারতে চিনির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ ছুঁয়েছে। কারণ, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল মৌসুমী বায়ু উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেন, এই সবকিছু মিলে খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে, এমনকি আগামী বছরজুড়েই এর বড় প্রভাব দেখা যাবে।

মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। এসব দেশের মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কিনতে ব্যয় করে। তাই চাল, ডাল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন হুট করে অনেক বেড়ে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে ওইসব দেশের একদম গরিব মানুষেরা।

বিশ্বব্যাংক ১৫০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এর ২২ শতাংশ দেশে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল। আগের প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুলাই) এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির এই হার অনেক দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। গত সেপ্টেম্বরে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্যসূচক বেড়ে গড়ে ১৩৬ পয়েন্ট হয়েছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামলাতে প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এতে বাজারে সরবরাহ আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে।

বহুমুখী সরবরাহসংকট:

কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য রপ্তানি অবকাঠামোতে হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে গম সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প বাজার খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। লোহিত সাগরে নিরাপত্তাহীনতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েই যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিও ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। তাছাড়া, এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফসলের উৎপাদন কমছে।

চলতি বছর বিশ্ববাজারে গমের দাম আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোয় চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। তারপর থেকে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনও বেশি।

নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, পণ্যের বাড়তি দামের কারণে ব্যবসায় চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি এখন এক কঠিন বাস্তবতা।

মিশরে ভর্তুকি ছাড়া বড় আকৃতির একেকটি রুটির দাম জুলাইয়ের ৪ মিশরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৫ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

মিশরের রাজধানী কায়রোর কেন্দ্রস্থলে বেকারি চালান সাঈদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ। তিনি জানান, কেবল ময়দার দামই বাড়েনি, দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ করতেও এখন অনেক অর্থ খরচ হয়। বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট ও রুটি তৈরিতে ব্যবহৃত সব উপকরণের দাম বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবংং যুদ্ধের কারণে পরিবহন খরচও বেড়েছে। কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা

২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছিল। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভাল ফসল উৎপাদন করায় এতদিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্যপণ্য কেনা কমিয়ে রেখেছিল। এখন তাদের আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেক্সান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকরা বাজারে ফিরলে চাহিদা নতুন করে বাড়তে পারে।

এফএওর তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত এতদিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। তবে সে সুরক্ষা ক্রমেই কমছে।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কিনলেও এখন চুক্তি নবায়ন করতে গিয়ে তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় আমদানি খরচ আরও বাড়ছে।

ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং বলেন, পণ্য পরিবহন খরচও বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার মুদ্রা রুপিয়ার মান কমে যাওয়ায় রুপিয়ায় হিসাব করলে এ ব্যয়ের প্রভাব আরও বেশি দেখা যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বেশি দাম দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করতেও সমস্যায় পড়ছে।

জাকার্তার আটা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি গমকল তাদের উৎপাদনক্ষমতার চেয়ে কম গম উৎপাদন করছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় সেপ্টেম্বরে গম আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।

তবে আপাতত সয়াবিন ও ভুট্টার পর্যাপ্ত মজুত আছে। ভবিষ্যতে এই দুই শস্যের সরবরাহ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status