ঢাকার এই হাসপাতালে আমার দুই সন্তানের জন্মে মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৭৫ টাকা
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Wednesday, 14 October, 2026, 8:02 PM
ঢাকার এই হাসপাতালে আমার দুই সন্তানের জন্মে মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৭৫ টাকা
ঢাকা শহরে সন্তান জন্মদানের জন্য অনেকেরই লাখ লাখ টাকা খরচ হয়। শহর এলাকায় অস্ত্রোপচারে জন্ম হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু। অনেকে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন বলে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। অথচ একটু খোঁজ নিলে বাড়ির কাছেই কম টাকায় সরকারি হাসপাতালের সেবা নেওয়া যায়। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষকের দুই সন্তানের জন্মে মোট খরচ হয়েছে ৭৫ টাকা। নিজের সেই অভিজ্ঞতাই লিখেছেন শিক্ষক নাজমুন নাহার
আমার দুই সন্তানের ডেলিভারিতে খরচ হয়েছে মাত্র ৭৫ টাকা। তা–ও দ্বিতীয় সন্তানের সময় জরুরি সেবা নিতে হওয়ায় ৬৫ টাকার টিকিট কাটতে হয়েছিল বলে খরচ বেড়েছে। প্রথম সন্তানের জন্মের সময় ১০ টাকার টিকিট কেটেছিলাম, খরচ বলতে সেটুকুই। তবে দুই সন্তানের জন্য পরে আরও ২০০ টাকা খরচ হয়েছে, সেটা হাসপাতাল থেকে তাদের জন্মসনদ নিতে।
ঢাকায় আমাদের ভাড়া বাসা, মোহাম্মদপুরে। স্বামী, শ্বশুর–শাশুড়ি নিয়ে বিয়ের পর এখানেই সংসার শুরু করি। স্বামী–স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। এর মধ্যে ২০২১ সালের শুরুর দিকে আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হলো। আর এ বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্ম হলো আমার দ্বিতীয় কন্যার।
আমার দুটি সন্তানের জন্মই হয়েছে মোহাম্মদপুরের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে। যে জায়গার আরও একটি নাম আছে, মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার। প্রথমবার গর্ভধারণের শুরুতে অন্য অনেকের মতোই ঢাকার বেশ কয়েকটি নামকরা চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে গিয়েছি। সেখানে নিজের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা হলো, যত বেশি নামকরা চিকিৎসক, তত লম্বা সিরিয়াল আর ভোগান্তি।
সেসব জায়গায় একটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিরিয়াল নিতে হয়। তারপর নির্ধারিত দিনে সেখানে গিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। সন্ধ্যা ৬টার সিরিয়াল, সময়মতো গিয়েও চিকিৎসকের রুমে পৌঁছাতে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার অপেক্ষা। আমার অনেক পরিচিত বন্ধুরও একই রকম অভিজ্ঞতা। কেউ কেউ সন্ধ্যা ৭টায় সিরিয়াল দিয়ে রাত ১২টার পর চিকিৎসক দেখাতে পেরেছেন। হাজার হাজার টাকায় চিকিৎসক দেখাতে হলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার কোনো মানে হয় না।
বাধ্য হয়ে তাই প্রথম গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ে বাড়ির কাছের এই মা ও শিশুস্বাস্থ্য হাসপাতালে গেলাম। পাঁচ টাকার টিকিট কেটে প্রাইভেট চেম্বারের চেয়ে তুলনামূলক কম সময় অপেক্ষা করে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের পরামর্শ নিলাম।
এখানে হয়তো কিছুটা লম্বা সিরিয়াল থাকে, তবে সময় হিসাব করলে প্রাইভেটের সেই অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক কম। চিকিৎসকও দেখেন অনেক যত্ন নিয়ে। কারও এই হাসপাতালে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে তিনি জানেন, ভেতরের পরিবেশও বেশ ভালো, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন।
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় যেসব ওষুধ প্রায় সব নারীকে খেতে বলা হয়—সেই ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিনের ওষুধও এখানে মেলে কোনো টাকা ছাড়াই।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বলে রাখি, আমার দুটি সন্তানই হয়েছে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে। আর প্রসবের সময় জটিলতা না থাকায় আমার সরাসরি চিকিৎসক দরকার হয়নি। এখানে পর্যাপ্ত মিডওয়াইফ আছেন, তাঁরাই সাধারণত প্রসবের দায়িত্বে থাকেন। তাঁদের দক্ষতা দেখে অবাক হয়েছি। একেকজন মায়ের পেছনে কয়েকজন করে মিডওয়াইফ থাকেন।
হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক প্রসবেই বেশি উৎসাহ দেওয়া হয়। তবে কারও অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তখন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের কথা ভাবেন। সেটাতেও বাড়তি কোনো খরচ নেই। শুরুতে যে টিকিট কাটা হবে, সেই খরচেই অস্ত্রোপচার হয়ে যাবে। তবে কোনো ওষুধ যদি হাসপাতালে সরবরাহ না থাকে, তাহলে সেটা বাইরে থেকে নিজেদের কিনে আনতে হয়। আর এই খরচটা রোগীদেরই বহন করতে হয়।
হাসপাতালটিতে ওয়ার্ড ছাড়াও দুই ধরনের কেবিন আছে—এসি ও নন–এসি। সেখানে কেউ থাকতে চাইলে খালি থাকা সাপেক্ষে পেতে পারেন, তার জন্য ঠিক কত টাকা খরচ হবে, সেটা সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তবে হাজার টাকার কমে যে কেবিন পাওয়া যাবে, সেটা নিশ্চিত।
আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছিল দুপুরের দিকে আর দ্বিতীয় সন্তান হলো সন্ধ্যায়। দুই সন্তানের ক্ষেত্রেই আমি রাতটুকু হাসপাতালে কাটিয়ে জটিলতা ছাড়া হেঁটেই বাসায় চলে এসেছি। সরকারি হাসপাতাল নিয়ে আমাদের অনেক অভিযোগ থাকে, কিন্তু দুবার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে আমি প্রাইভেট ও সরকারি হাসপাতালের মধ্যে যে ফারাকটা টের পেয়েছি, সেটা অনেক বড়।