|
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৬%, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ১০.৯%: আইএমএফ
জ্বালানি ব্যয় ও বৈদেশিক লেনদেনের চাপে আগামী বছর অর্থনীতিতে বাড়তি ঝুঁকির আশঙ্কা
সায়ীদ আবদুল মালিক, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
|
![]() বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৬%, মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ১০.৯%: আইএমএফ গতকাল মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে প্রকাশিত আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি বিভিন্ন ধাক্কা সামলে এগোলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে রয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রবৃদ্ধি বাড়লেও গতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। তবে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থাৎ চলতি বছরে প্রবৃদ্ধিতে সামান্য উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও আগামী বছর অর্থনীতির গতি দুর্বল হতে পারে। এর প্রভাব বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং চীনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নেপালের সমান ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে বিভিন্ন দেশের অর্থবছর ও হিসাবের সময়সীমায় পার্থক্য থাকায় এসব পরিসংখ্যান তুলনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় মূল্যস্ফীতি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু ২০২৭ সালে আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এ পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে আগামী বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে আমদানি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়তে পারে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ছিল জিডিপির প্রায় শূন্য শতাংশ। ২০২৬ সালে তা ঘাটতিতে পড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে এ ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়লে আমদানি ব্যয়, রফতানি আয়, প্রবাসী আয় ও সেবা খাতের বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি বিল বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সৃষ্টি করবে। তবে রিজার্ভ ও ডলারের বাজারে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে রফতানি, প্রবাসী আয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপরও। জ্বালানির উচ্চমূল্যে বাড়তি চাপ আইএমএফের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। জুনের শুরুতে তা ১০০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়। সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রফতানি যুদ্ধের আগের স্তরের ৮৮ শতাংশে পৌঁছায়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি থাকতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়তে পারে ৪৮ শতাংশ। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জ্বালানি আমদানিতে বেশি ডলার ব্যয় হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষির উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে। রফতানিমুখী শিল্পে ব্যয় বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখাকে কঠিন করে তুলতে পারে। লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় জোর জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারদর কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার ব্যবস্থায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। সংস্থাটি রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং ঋণকে টেকসই পর্যায়ে রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার ও বিকল্প উৎসের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নয়; মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হতে পারে। তাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
