ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ● ১১ অক্টোবর ২০২৬ ● ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
আইএমএফের কঠিন শর্তে অনাগ্রহ, বিকল্প অর্থায়নে নজর সরকারের
ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় পরীক্ষা
সায়ীদ আবদুল মালিক, ব্যাংকক থেকে
প্রকাশ: Sunday, 11 October, 2026, 7:46 PM

আইএমএফের কঠিন শর্তে অনাগ্রহ, বিকল্প অর্থায়নে নজর সরকারের

আইএমএফের কঠিন শর্তে অনাগ্রহ, বিকল্প অর্থায়নে নজর সরকারের

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, সরকারি ঋণের চাপ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এ সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা হবে। বাংলাদেশের জন্য এবারের সভার গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি। নতুন ঋণ কর্মসূচি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং বিকল্প অর্থায়নের পথ খোঁজার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারিত হতে পারে এ আলোচনায়।

সরকারের লক্ষ্য আইএমএফের কাছ থেকে নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা। তবে কঠিন শর্তে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সরকারের অনাগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বার্ষিক সভার সাইডলাইনে আইএমএফের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও আগের কর্মসূচির অসম্পূর্ণ শর্ত নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। আলোচনায় অগ্রগতি হলে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।

নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরবে সরকার

বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিনিধি দলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার রয়েছেন।

সরকারের বক্তব্য, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজস্ব উদ্যোগে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। সরকারের মূল্যায়নে, বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, জিডিপির তুলনায় কম রাজস্ব আয় এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সামনে তুলে ধরা হবে।

রাজস্ব আয় বাড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির তুলনায় রাজস্বের অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর করব্যবস্থা, রাজস্ব ফাঁকি কমানো এবং সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আগের ঋণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা

২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। পরে কর্মসূচির পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এর আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৮০ কোটি ডলার পেয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে যায়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর উদ্যোগ নেয় আইএমএফ। তবে নতুন সরকার আগের কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন ঋণ প্যাকেজের জন্য আবেদন করেছে বলে ৩ জুন আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার জানিয়েছিলেন।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, আইএমএফের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় সরকার। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন আনা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন, যা উন্নয়ন সহযোগীদের সীমিত অর্থায়নে মেটানো কঠিন। এ জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ এবং দেশি-বিদেশি পুঁজিবাজার কাজে লাগিয়ে বিকল্প অর্থায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিকল্প উৎস থেকে ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ও দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যয় বেশি হলে তা ভবিষ্যতে সরকারি অর্থের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুধু বিদেশি ঋণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, ব্যবসার ব্যয় কমানো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিপরিবেশ।

রফতানি বহুমুখীকরণও জরুরি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে নতুন কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সহজ অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় সুরক্ষা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

অর্থায়নের পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবায়ন

ব্যাংককের সভায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, সরকারি ঋণের ঝুঁকি, কর্মসংস্থান ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। প্রায় ৩৫ বছর পর থাইল্যান্ডে ফিরছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এ বার্ষিক আয়োজন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ সভা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরির মঞ্চ।

বাংলাদেশের জন্য এবারের সভায় দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরি এবং নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা। ঋণের পরিমাণ ও শর্ত নিয়ে সমঝোতার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, রাজস্ব বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে, ব্যাংককে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় পরীক্ষা হবে শুধু নতুন ঋণ পাওয়া নয়; বরং অর্থায়নের শর্ত, বিকল্প উৎসের ব্যয় এবং সংস্কার বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতিপথ নির্ভর করবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপর। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status