|
জন্মের তিন দিনের মাথায় মা, ৯ বছরেই বাবাকেও হারাল আরফা
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() জন্মের তিন দিনের মাথায় মা, ৯ বছরেই বাবাকেও হারাল আরফা এখন দাদি ও চাচাদের স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে উঠছে মা-বাবাহারা এই শিশুটি। তবে তাকে ঘিরে পরিবারটির সবচেয়ে বড় চিন্তা-অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হাতে থাকা মুঠোফোনে বাবার সঙ্গে নিজের ছবি দেখাচ্ছিল আরিফিন ইসলাম আরফা। এরপর দেখাল মা-বাবার বিয়ের ছবি। একপর্যায়ে একটি কবরের পাশে তার ছোটবেলার ছবি বের করে বলল, ‘এটি মায়ের কবর।’ এরপর আরেকটি কবরের ছবি দেখিয়ে বলল, ‘এটি বাবার কবর।’ নিজে থেকেই জানাল, বাবাকে বাবার বাড়িতে আর মাকে মায়ের বাড়িতে কবর দেওয়া হয়েছে। মা-বাবার কথা বলতে বলতে প্রিয় বিড়াল ভুতুমকে কোলে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য আগের মন খারাপের কথা ভুলে গেল আরফা। একটু পরেই রংপেনসিল নিয়ে বসে গেল ছবি আঁকতে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার একটি বাসায় আরফার সঙ্গে কথা হয়। এ ভাড়া বাসাতেই তাজুল ইসলাম মেয়ে, এক ভাইয়ের পরিবার, বাবা ও মাকে নিয়ে থাকতেন। পাশেই বড় ভাই শফিকুল ইসলামের বাসা। তাজুল ইসলাম একটি মুদিদোকান চালানোর পাশাপাশি ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলার ছিলেন। আরফা রাজধানীর রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আগে বাবা ও দাদির সঙ্গে স্কুলে যেত। এখন যায় দাদির সঙ্গে। আরফার দাদি সখিনা বেগম ও বড় চাচা মো. শফিকুল ইসলাম বারবার বলছিলেন, দাদা, দাদি বা চাচারা আছেন, তারা আরফাকে দেখবেন। কিন্তু বাবা তো বাবাই। বাবা বেঁচে থাকলে মেয়েটা যেভাবে বড় হতো, এখন চাইলেও হয়তো সেটা হবে না। এত ছোট বয়সে আরফা মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে ফেলেছে। তার ভবিষ্যৎ নিয়েই এখন অনিশ্চয়তা। শফিকুল ইসলাম বলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই তাজুল ইসলাম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মেয়ের কথা চিন্তা করে আর বিয়ে করেননি। একই সঙ্গে তিনি আরফার মা ও বাবার ভূমিকা পালন করতেন। তবে নিজের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে ছিলেন উদাসীন। নিয়ম মানতে চাইতেন না। যক্ষ্মা, করোনা, চিকুনগুনিয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মারা গেলেন ডেঙ্গুতে। মেয়ের কথা চিন্তা করলেও আরফার ভবিষ্যতের জন্য তাজুল কোনো টাকাপয়সা জমিয়ে রাখেননি বা ব্যাংকে রেখে যাননি বলে জানান শফিকুল ইসলাম। তার মৃত্যুর পর পাওনাদারেরা এসে টাকা দাবি করছেন। দেনা শোধ করতে হচ্ছে। তাজুল নিজে কারও কাছে কোনো টাকা পেতেন কি না, সেসব নিয়েও কখনো কিছু বলেননি বা বলে যাননি। একদিকে তাজুলের মেয়ের ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে দেনা শোধের চাপ; সব মিলিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। তাজুল ও তার স্ত্রী মারুফা আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। প্রেমের সম্পর্ক থেকে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয় ২০১৪ সালে। ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মেয়ের জন্মের পর শারীরিক জটিলতায় আরফার মা নড়াইল থেকে যশোরে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর শফিকুল ইসলামসহ অন্যরা আরফাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর দাদি সখিনা বেগম মায়ের মতো আদর-স্নেহে বড় করছেন নাতনিকে। সখিনা বেগম বলেন, ‘আমারও তো বয়স হইছে। কখন কী হয়। নাতনিটা আরেকটু বড় হইলে আমার ছেলেটা যদি মরত, চিন্তা একটু কম হইত। আমার ছেলেরা ভালো ভালো জায়গা থেইক্যা পড়াশোনা করছে। হালাল আয় করে। কিন্তু ছেলেদের আর্থিক অবস্থা তো ভালো না। সরকার বা অন্য কেউ আমার নাতনির পাশে দাঁড়াইতে চাইলে আপত্তি করব না।’ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তিন ভাই, এক বোন ছিলাম। তাজুল ছিল ছোট। আমরা তো ভাবতেও পারিনি মশার কামড়ে আমাদের ভাইটা সবার আগে চলে যাবে। সরকার ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, কিন্তু আমরা রেজাল্ট তো পাচ্ছি না।’ আরফার সঙ্গে তার স্কুল ও বন্ধুদের নিয়ে নানা বিষয়ে গল্প হচ্ছিল। একপর্যায়ে জানতে চাওয়া হয়, বাবার কথা কখন বেশি মনে পড়ে। তখন সে বলতে থাকে, ‘বাবার দোকানে যাইতাম। বাবা মাঝেমধ্যে টাকা দিত। বাবা ঘুরতে নিয়া যাইত। মে মাসেও ঘুরতে নিছিল। বাবা হাসপাতালের আইসিইউতেও বলছিল, তার বেশি কিছু হয় নাই, বাসায় আইসা পড়ব। এখন বাবা ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না।’ কথা বলতে বলতেই দাদির কাছে ভাত খাওয়ার বায়না ধরল আরফা। দাদি সখিনা বেগম মুরগির মাংস-আলুর ঝোল দিয়ে ভাত মেখে পাশে বসে নাতনিকে খাইয়ে দিচ্ছিলেন। বললেন, মুখে তুলে খাইয়ে দিলে একটু পেট ভরে খায়, নিজে হাতে খেলে নাতনির পেট ভরে না। মা নেই, বাবা নেই। ছোট্ট আরফার এখন ভরসা দাদি-চাচারা। তাদের স্নেহে সে বড় হবে- এই আশাটুকুই পরিবারের। তবে সেই পথ যেন মসৃণ হয়, তার জন্য প্রয়োজন আরফার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার একটি নিরাপদ অবলম্বন। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
