ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ● ৬ অক্টোবর ২০২৬ ● ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
কর্মী সংকটে ধুঁকছে পাহাড়তলী ডিজেল শপ, ৩৩০ পদের বিপরীতে ১১০
মো. মোক্তার হোসেন বাবু
প্রকাশ: Tuesday, 6 October, 2026, 6:58 PM

কর্মী সংকটে ধুঁকছে পাহাড়তলী ডিজেল শপ, ৩৩০ পদের বিপরীতে ১১০

কর্মী সংকটে ধুঁকছে পাহাড়তলী ডিজেল শপ, ৩৩০ পদের বিপরীতে ১১০

রেললাইনে একটি লোকোমোটিভ বিকল হলে সেটি মেরামত করে দ্রুত সচল করাই পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার (ডিজেল শপ) প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকটে সেই কাজই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কারখানাটিতে কর্মরত মাত্র ১১০ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত জনবলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদই শূন্য।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এই কারখানা। বছরের পর বছর নতুন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের অবসরের কারণে দক্ষ জনবলের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে অল্পসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা দিয়ে কাজ সামলাতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দৈনিক মজুরি ও অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তাও নিতে হচ্ছে।

শুধু জনবল নয়, লোকোমোটিভ সচল রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টসের সংকট। পূর্বাঞ্চলের অনেক মিটারগেজ লোকোমোটিভ দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় নিয়মিত মেরামত ও যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এসব যন্ত্রাংশের একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলার সংকট, ব্যাংকিং জটিলতা, ঋণপত্র (এলসি) খোলা, বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সময়মতো কারখানায় পৌঁছায় না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি যন্ত্রাংশের চাহিদাপত্র দেওয়ার পর বাজেট ও প্রশাসনিক অনুমোদনের একাধিক ধাপ পেরিয়ে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পাহাড়তলী) দপ্তর থেকে সেটি হাতে পেতে কখনো কখনো এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। ফলে মেরামতের জন্য আনা লোকোমোটিভ দীর্ঘ সময় কারখানায় পড়ে থাকে।

পুরোনো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ খুলে চলছে কাজ

জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকলে বিকল্প হিসেবে অনেক সময় অচল বা পুরোনো লোকোমোটিভ থেকে সচল যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইঞ্জিনে ব্যবহার করা হয়। এতে কোনো একটি লোকোমোটিভ সাময়িকভাবে সচল করা গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। বরং একটি ইঞ্জিন সচল করতে গিয়ে অন্য একটি ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা আরও কমে যায়।

লাইন থেকে বিকল লোকোমোটিভ পাহাড়তলী ডিজেল শপে পৌঁছানোর পর দ্রুত সেটিকে মেরামত করে লাইনে ফেরানোর চাপ থাকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক সময় নির্ধারিত গভীর সংস্কার বা ওভারহোলিং করা সম্ভব হয় না। তখন দ্রুত মেরামত বা ‘কুইক ফিক্স’ করে ইঞ্জিনটি আবার লাইনে পাঠানো হয়।

এর ফলও দেখা যায় দ্রুত। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর একই ত্রুটি নিয়ে কোনো কোনো লোকোমোটিভ আবার কারখানায় ফিরে আসে। কারিগরি ভাষায় যাকে বলা হয় ‘রিপিট ফেইলিওর’।

একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হয়ে কারখানায় ফিরে এলে একদিকে মেরামত বিভাগের ওপর কাজের চাপ বাড়ে, অন্যদিকে ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত ইঞ্জিনের সংখ্যা কমে যায়। তখন সচল থাকা অন্য লোকোমোটিভগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে।

সংকটের মধ্যেও ১৯ লোকোমোটিভ সচল

জনবল ও যন্ত্রাংশের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মীরা বেশ কিছু মৃতপ্রায় ও দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সচল করেছেন।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চারটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাঁচটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করা হয়।

চার অর্থবছরে মোট ১৫টি মৃতপ্রায় ও চারটি দুর্ঘটনাকবলিত—সব মিলিয়ে ১৯টি লোকোমোটিভ সম্পূর্ণ সচল করে রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়েছে।

কারখানা সূত্র জানায়, গত তিন থেকে চার বছরে এখানকার কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আটটি লোকোমোটিভের ছোট-বড় মেরামত ও লাইট ওভারহোলিং করেছেন। ঈদ উপলক্ষে ট্রেনের চাপ বেড়ে গেলে প্রস্তুতিও বাড়াতে হয়। প্রতিটি ঈদের আগে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ মেরামত ও প্রস্তুত করে লাইনে পাঠানোর কাজ করেছে কারখানাটি।

আধুনিক ইঞ্জিনও আসছে মেরামতে

শুধু পুরোনো মিটারগেজ ইঞ্জিন নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পাহাড়তলী ডিজেল শপে মেরামত করা হয়েছে।

ফলে পুরোনো ও আধুনিক—দুই ধরনের লোকোমোটিভের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বই পালন করতে হচ্ছে এই কারখানাকে।

যুক্ত হয়েছে অটোমেশন প্রযুক্তি

জনবল সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি কারখানাটির কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতেও নেওয়া হয়েছে কিছু উদ্যোগ। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থাপন করা হয়েছে দুটি আধুনিক অটোমেশন মেশিন।

এর একটি স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিক মেশিন। এর মাধ্যমে লোকোমোটিভের জটিল বৈদ্যুতিক ও জ্বালানি ব্যবস্থার ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

অন্যটি পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিন। এর মাধ্যমে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া দেশীয় প্রযুক্তিতে জিব ক্রেন, এসি মোটর টেস্টিং প্ল্যান্ট এবং কম্প্রেসর টেস্টিং প্ল্যান্ট তৈরি ও স্থাপন করা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হলেও দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি থাকলে এসব প্রযুক্তির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব নয়।

প্রয়োজন দ্রুত নিয়োগ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ

পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতির কারণে মেরামতকাজ চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। জনবল সংকট মোকাবিলা ও কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের জন্য অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এসব প্রযুক্তি এখনো অপ্রতুল।

তিনি বলেন, সরঞ্জাম বিভাগ বাজেট ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে আমদানিকৃত মালামাল দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে কারখানার কাজের গতি বাড়বে। একই সঙ্গে লোকোমোটিভ সচল করার হারও বাড়ানো সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাহাড়তলী ডিজেল শপের দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে শূন্য পদে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিজ্ঞ কর্মীদের জ্ঞান ও দক্ষতা নতুন কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সময়মতো বাজেট বরাদ্দ ও জেনুইন স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

কারণ একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হওয়ার প্রভাব শুধু মেরামত কারখানার ওপর পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ট্রেনের সময়সূচি, যাত্রীসেবা এবং পুরো রেল বহরের কার্যক্ষমতা।

সীমিত জনবল, যন্ত্রাংশের ঘাটতি ও নানা প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মীরা পূর্বাঞ্চলের রেল বহর সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে হলে এখনই জনবল ও স্পেয়ার পার্টসের সংকট দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status