|
কে পাচ্ছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() কে পাচ্ছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার আগামী ৯ অক্টোবর ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কথা। এই পুরস্কারের মাধ্যমে নোবেল কমিটি বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে যে, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতিষ্ঠান ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। শুধু কূটনৈতিক প্রচার বা বড় বড় বক্তব্যের মাধ্যমে শান্তি আসে না। বাজির বাজারে ট্রাম্পের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও তিনি পুরস্কারটি পাবেন না। শান্তির উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি পুরস্কারের প্রার্থী হিসেবে এমন একজন প্রেসিডেন্টকে বিবেচনা করা কঠিন, যিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। বিশ্বের অন্য কোথাও ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগ থাকলেও নোবেল কমিটি একজন প্রার্থীর সামগ্রিক অবদান বিবেচনা করবে। সেই রেকর্ডের মধ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ক্ষেত্রেও পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। একটি বড় যুদ্ধে জড়িত দেশের দায়িত্বে থাকা কমান্ডার-ইন-চিফকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিলে এই পুরস্কার সংঘাতের একটি পক্ষকে সমর্থন করছে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে। ইউক্রেনের আত্মরক্ষার অধিকার থাকলেও এমন ঝুঁকি থেকে যাবে। এ ধরনের পুরস্কার আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার সঙ্গেও কিছুটা অসংগতিপূর্ণ। নোবেল তার উইলে জাতিগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, স্থায়ী সেনাবাহিনীর সংখ্যা ও শক্তি কমানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শিরোনামে থাকা আলোচিত নামগুলোর বাইরে তাকালে দেখা যায়, সেভ দ্য চিলড্রেন, সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও পলিমার্কেটের তালিকায় বেশ ওপরের দিকে রয়েছে। বর্তমানে এই তিন প্রার্থীর সম্মিলিতভাবে পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা ২৮ শতাংশ বলে দেখাচ্ছে পলিমার্কেট। এসব প্রার্থীর ক্ষেত্রে বাজারের পূর্বাভাস হয়তো ফলাফলের কাছাকাছি যেতে পারে। তবে বিশ্বের সবচেয়ে যোগ্য শান্তি প্রতিষ্ঠাকারীদের কয়েকজনের নাম এই তালিকায় নেই। আমি পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো বা পিআরআইওর প্রধান। এটি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। দেশ, বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির শর্ত নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা করে। আমাকে প্রায়ই প্রশ্ন করা হয়, বর্তমান বিশ্বে এত বড় আকারের সংঘাত চলার পরও নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া উচিত কি না। ইউক্রেন ও সুদানের যুদ্ধ এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। ইরানকে ঘিরে চলা যুদ্ধ আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে আরও একটি বিপজ্জনক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আমাদের সর্বশেষ সংঘাতের প্রবণতাবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে রাষ্ট্রভিত্তিক সশস্ত্র সংঘাতের সংখ্যা ছিল ৬৫টি। ১৯৪৬ সালে এ ধরনের হিসাব শুরু হওয়ার পর এটি সর্বোচ্চ সংখ্যা। এমন পরিস্থিতি আমার বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে যে, বিশ্বে যত বেশি যুদ্ধ থাকবে, নোবেল শান্তি পুরস্কারের গুরুত্বও তত বেশি হবে। পুরস্কারের মাধ্যমে সম্মান জানানোর মতো যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। প্রতি বছর আমি এমন কিছু প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করি, যারা আমার কাছে এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বলে মনে হয়। আগের বছরগুলোর তালিকায় থাকা কয়েকজন পরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এ বছর আমার তালিকায় রয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি। কোনো নিয়ম তখনই কার্যকর থাকে, যখন তা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। এই আদালতগুলো এমন একটি নীতি রক্ষা করে, যা এখন ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। নীতিটি হলো, শক্তিশালী দেশ ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। এমন সময়ে এই আদালতগুলোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা জানাও জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন তথ্য ও প্রমাণ। সাংবাদিকরা সেই প্রমাণ তুলে ধরেন। অনেক সময় এর জন্য তাদের জীবন ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৩২ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের হিসাবে এটি ছিল রেকর্ড শুরুর পর সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। সিপিজে জানিয়েছে, এসব মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের জন্য ইসরায়েল দায়ী। সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়া মানে যুদ্ধের সময় কী ঘটছে, তা জানার সুযোগ রক্ষা করা। জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে সিপিজে নোবেল শান্তি পুরস্কারের একজন উপযুক্ত প্রাপক হতে পারে। বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। সেভ দ্য চিলড্রেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের মধ্যে শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। ইউক্রেনে মাইকোলা কুলেবার প্রতিষ্ঠান সেভ ইউক্রেন রাশিয়া ও রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে ১ হাজার ৭০০টির বেশি শিশুকে ফিরিয়ে এনেছে। সুদানে ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস স্থানীয় জনগণের নেতৃত্বে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। যুদ্ধের মধ্যেও এসব নেটওয়ার্ক খাবার, চিকিৎসা এবং জীবন রক্ষাকারী অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা স্থিতিশীলতা আনে। এটি সংঘাতের ঝুঁকিও কমায়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস এর একটি অসাধারণ উদাহরণ। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো সেখানে শান্তিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। পৃথিবীতে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও এই সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। আইএসএস এখন তার কার্যক্রম বন্ধ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে মহাকাশে কার্যক্রম বাড়ছে। বাণিজ্যিক ব্যবহারও বাড়ছে। সামরিক ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। এমন সময়ে এই অংশীদারত্বকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হলে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা কী অর্জন করতে পারে, তা তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে মহাকাশকে অভিন্ন নিয়ম এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালনার গুরুত্বও সামনে আসবে। শান্তি এমন কিছু নয়, যা নিজে থেকেই তৈরি হয়। শান্তি আমাদের গড়ে তুলতে হয়। অনিশ্চয়তা কমানোর জন্য সহযোগিতা প্রয়োজন। নিষ্ঠুরতা নিয়ন্ত্রণের জন্য মানবিক আইন প্রয়োজন। অপরাধের পরিণতি নিশ্চিত করার জন্য আদালত প্রয়োজন। আর লঙ্ঘনের ঘটনা যেন সহজে মুছে ফেলা না যায়, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সাংবাদিকদের। আন্তর্জাতিক শান্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে বিশ্বের মনোযোগ ফেরানোর সুযোগ নোবেল কমিটির সামনে রয়েছে। বিশ্বে যখন সংঘাতের সংখ্যা একের পর এক নতুন রেকর্ড তৈরি করছে, তখন কমিটির উচিত আলোচিত বড় নামগুলোর বাইরে তাকানো। শান্তি প্রতিষ্ঠার কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ যারা করছেন, তাদের দিকেও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
