|
চট্টগ্রামে দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু
একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে মেতেছিলেন, ছবিও তুলেছেন, ফিরলেন লাশ হয়ে
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে মেতেছিলেন, ছবিও তুলেছেন, ফিরলেন লাশ হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে কনের মা–বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনেরা কক্সবাজারের গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন একটি মাইক্রোবাসে করে। চট্টগ্রাম নগর থেকে ফেরার পথে সে মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয় কাভার্ড ভ্যান। দুমড়েমুচড়ে যাওয়ায় মাইক্রোবাসে থাকা চারজনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে তিনজনই কনের ভাই, বোন ও মামা। অন্যজন মাইক্রোবাসের চালক। আহত হয়েছেন মা-বাবাসহ চারজন। তাঁদের সবার অবস্থা গুরুতর। গতকাল শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা চৌমুহনী এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন মোরশেদ নেওয়াজ মেহেদী (২৬), তাঁর বোন কলেজছাত্রী জাছিয়া ইসমে মিমতা (২০), মামা ফেরদৌস আলম (৫৫) এবং মাইক্রোবাসের চালক হাছান মোহাম্মদ মুন্না (৪২)। আহত ব্যক্তিরা হলেন মোরশেদ-মিমতার বাবা মনজুর আলম ও মা নীলুফা ইয়াছমিন, স্বজন আবুল কালাম ও আরফা বেগম। আহত ও নিহত ব্যক্তিদের সবার বাড়ি কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলায়। গুরুতর আহত মনজুর আলম ও নীলুফা আখতার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আবুল কালামকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আরফা বেগমকে ভর্তি করা হয়েছে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তাঁদের সবার অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। বিষাদের যাত্রা মনজুর আলম ও নীলুফা ইয়াছমিনের বড় মেয়ে তাম্মিন ফায়েছা ফাহিমের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদে একটি রেস্তোরাঁয়। এই বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কক্সবাজার থেকে এসেছিলেন পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনেরা। বিয়ের অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসব ও আনন্দের রেশ। সবাই মিলে ছবি তুলেছেন, গল্প করেছেন, দিয়েছেন আড্ডা। অনুষ্ঠান শেষে মধ্যরাতে বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি নেন কনেপক্ষের লোকজন। কয়েক ঘণ্টা আগেও যাঁরা বিয়ের আনন্দে একসঙ্গে ছিলেন, তাঁরাই ফিরছিলেন একই গাড়িতে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ভোরের দিকে বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই বদলে গেল সবকিছু। দিবাগত রাত দুইটার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের কর্ণফুলীর শিকলবাহা চৌমুহনী এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় দুমড়েমুচড়ে যায় তাঁদের মাইক্রোবাস। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বস্তি নিয়ে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি পরিণত হলো বিষাদের যাত্রায়। যে গাড়িতে সবাই মিলে বাড়িতে ফেরার কথা ছিল, সেই গাড়িই মুহূর্তে হয়ে গেল মৃত্যুর বাহন। একসঙ্গে যাত্রা শুরু করা মানুষগুলোর মধ্যে চারজন আর ফিরলেন না। দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত পেরিয়ে ভোরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে স্বজনদের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ আহত স্বজনের খোঁজ করছেন, কেউ চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাঁর অবস্থা জানার চেষ্টা করছেন। কয়েক ঘণ্টা আগেও যাঁরা বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলেন, তাঁদের স্বজনদের কেউ এখন হাসপাতালের শয্যায়, কেউ হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষায়। আনন্দের রাতের পর তাঁদের সামনে এখন অনিশ্চয়তা ও শোক। কনের মা–বাবা ও মামা গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের স্বজনেরা চিকিৎসার জন্য ছুটছেন, আহত ব্যক্তিদের খবর নিচ্ছেন। একই পরিবারের জন্য রাতটি যেন মুহূর্তেই বদলে গেছে। যে রাতে পরিবারের মেয়ের বিয়ে নিয়ে আনন্দ করার কথা, সেই রাতেই তাঁদের সামনে এসেছে চারটি মৃত্যুর শোক। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে বাড়িতে ফেরার সময় হয়তো কেউ ভাবেননি, এই যাত্রাই তাঁদের জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে। চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় নিহত মোরশেদ-মিমতার মামা আজিজুল হকের সঙ্গে। তিনি নিজেও এ দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন ভাই ফেরদৌস আলমকে। এভাবে ভাই ও ভাগনে-ভাগনি হারানোর বেদনায় স্তম্ভিত আজিজুল হক বলেন, ‘বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে সবাই একসঙ্গে রওনা দিয়েছিলাম চারটি গাড়িতে করে। বোন এবং ভাগনে-ভাগনিদের বহনকারী গাড়ি তেলের জন্য একটি জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। এ সময় আমাদের গাড়ি অনেক দূর চলে যায়। ক্লান্ত এবং রাত হওয়ায় গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একটি ফোন আসে। এরপর খবর শুনে কাঁপতে থাকি। গাড়ি ঘুরিয়ে এসে যেটি দেখেছি, সেটির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। সে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে আজিজুল হক বলেন, গাড়ির সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে গেছে। কাচ ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। গাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখি, রক্ত আর রক্ত। পুলিশ ও আশপাশের লোকজনের সহায়তায় গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসি। কিন্তু সবার অবস্থা খারাপ। এভাবে ভাগনে-ভাগনিদের হারিয়ে ফেলব, তা ভাবিনি। এখন বোন ও দুলাভাইকে নিয়ে চিন্তা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের পথে সেই রাতের যাত্রায় গন্তব্য ছিল বাড়ি; কিন্তু চারজনের জন্য পথেই শেষ হয়ে গেছে সব পথচলা। আর দুর্ঘটনায় যাঁরা বেঁচে গেছেন, তাঁরাও লড়ছেন হাসপাতালের শয্যায় জীবনের সঙ্গে। প্রিয়জনদের সামনে একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে আহত ব্যক্তিদের সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষা। হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেলা দেড়টায় চারটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনেরা। রাতে বাড়িতে ফেরার সময় তাঁরা ছিলেন এক গাড়িতে। এখন ফিরছেন চারটি গাড়িতে—চারজনের নিথর শরীর। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে পরিবারটি বিয়ের আনন্দে একসঙ্গে ছিল, সেই পরিবারেই এখন কান্না। নতুন একটি সম্পর্কের শুরু উদ্যাপন করতে গিয়ে তাঁরা হারিয়েছেন স্বজনদের। বিয়ের রাতের সেই আনন্দ তাই শেষ হয়েছে এক গভীর বিষাদে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
