অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর আকুতি, চুরি করে হলেও দুই ফোঁটা পানি দাও বাবা
ঘুমাস নে মা চোখ খোলা রাখ: অসহায় বাবার আকুতি
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Monday, 8 April, 2019, 1:13 AM
অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর আকুতি, চুরি করে হলেও দুই ফোঁটা পানি দাও বাবা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রীটি যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। বারবার পানি চাইলেও তাকে পানি দেয়া হচ্ছে না।
রোববার সকালে বাবাকে পেয়ে ছাত্রীটি তার কাছে পানির জন্য আকুতি জানান। পানি দেয়া চিকিৎসকদের নিষেধ বলায় অনুনয় করে ছাত্রীটি বলেন, ‘বাবা আমার গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে। চুরি করে হলেও দুই ফোঁটা পানি দাও বাবা।’ শরীরে ৭০ শতাংশের বেশি পোড়া ক্ষত নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন ছাত্রীটি। মেয়েকে দেখতে গিয়ে অজানা আশঙ্কায় তাকে চোখ বন্ধ না করার আকুতি জানান অসহায় বাবা। তিনি বলেন, ‘ঘুমাস নে মা চোখ খোলা রাখ।’
বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মেয়ের কাছে দুপুর ১টার দিকে যান অসহায় বাবা। আইসিইউ থেকে বেরিয়ে তিনি নানা কথা বলেন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে চেয়েছে, পানি খেতে চেয়েছে। চোখ বন্ধ করলে আদরের মেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তিনি বলেন, ‘ঘুমাস নে মা। চোখ খোলা রাখ। জানি, তোর খুব কষ্ট হচ্ছে। তবু চোখ বন্ধ করিস না মা।’ তিনি আরও বলেন, তার মেয়ের কিছু হলে তিনি বাঁচবেন না। তার একমাত্র মেয়েটি খুব শান্ত আর মেধাবী। পড়াশোনায় সব সময় সে প্রথম হয়। দাখিল পরীক্ষায় সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তিনি এখন তার মেয়েকে বাঁচাতে চান। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, তার যেন সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত হয়। দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, আমার মেয়েকে আপনারা বাঁচান। আল্লাহ যেন আমার মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখেন। ছাত্রীটির বাবা আরও বলেন, আমিও ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি। আমার ছেলেমেয়েও পড়ছে। আগে এমন জানলে আমার মেয়েকে এ মাদ্রাসায় দিতাম না। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই। মেয়ের জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। হাসপাতালের বারান্দায় ছাত্রীটির মায়ের পায়ের কাছে বসে বিলাপ করছিলেন তার দুই ভাই। মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। অপরদিকে মেয়ের একটু স্বস্তির জন্য একবার মেয়ের কাছে আবার চিকিৎসকের কাছে ছুটছিলেন অসহায় বাবা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে বোনটি সবার ছোট। আদরের ছোট বোনকে দেখতে আইসিইউর দরজায় বারবার উঁকি দিচ্ছিল ছোট ভাই। তার দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। তার গাল ভিজে যাচ্ছিল বারবার। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করছিল বোনের জন্য। ছোট ভাই জানান, বাড়িতে বোনটি তাদের সবাইকে আনন্দে মাতিয়ে রাখে। এখন আমার বোনের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। বোন আমার কথাও বলে না। বোনের কিছু হলে । কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
ছাত্রীটিকে আইসিইউতে রাখার পর থেকে তার মা এর পাশেই রয়েছেন। বুক চাপড়িয়ে হাউমাউ করে তিনি প্রায় কাঁদছেন। সেখানে গেলে তিনি বলেন, তার মেয়ে অনেক সময় পানি খেতে চায়। কিন্তু ডাক্তারের মানা থাকায় পানি দিতে পারি না। তিনি বলেন, তার মেয়ে হঠাৎ হঠাৎ চোখ খোলে, তাকিয়ে থাকে। কথা বলতে পারে না। পরীক্ষার দিন মেয়ে তাকে সালাম করে বের হয়েছিল। মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, ভালো করে পরীক্ষা দিতে। আজ সেই মেয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আর্তনাদ করে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে তুমি (সৃষ্টিকর্তা) ভিক্ষা দাও। আমার মেয়েকে তুমি বাঁচিয়ে রাখো।’ এরপর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছাত্রীটির সেরে ওঠা নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে রয়েছেন আত্মীয়স্বজনরা। তার জন্য সবাই প্রার্থনা করছেন। ছাত্রীটির এমন শারীরিক অবস্থার কারণে তার মায়ের কান্না থামছে না।
বাড়ির পাশের মাদ্রাসাটিতে ছাত্রীটির বড় ভাই পড়াশোনা করেছেন। ছোট ভাইও পড়ছেন। তাদের বাবা ও দাদাও এ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। বোনের ওপর এমন আক্রমণ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না বড় ভাই। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আলিম পরীক্ষা চলছিল। প্রশাসনের লোকজনও ছিল চারপাশে। এমন পরিবেশে কি করে সন্ত্রাসীরা এমন ঘটনা ঘটাল। শনিবার সকালে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিতে গেলে ছাত্রীটিকে ওই মাদ্রাসা ভবনের ছাদে নিয়ে দুর্বৃত্তরা তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফেনী সদর হাসপাতাল থেকে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।
মেয়েটিকে দেখে সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকন জানান, কুখ্যাত সন্ত্রাসী অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা ২২ বছর ধরে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের চেয়ারটি দখল করে আছে। তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, নির্যাতনসহ বহু অভিযোগ রয়েছে। মাদ্রাসা ও আশপাশ ঘিরে অধ্যক্ষ একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছে। নানা অভিযোগে ২০১৬ সালে জামায়াত থেকে অধ্যক্ষকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া নাশকতা ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ফেনী সদর ও সোনাগাজী মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে। এ সময় মামলায় তিনি জামিনে ছাড়া পান।