ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩
‘একটা পায়ের দাম ৫০ লাখ টাকা দিলে তো বাজারে এর একটা দাম নির্ধারণ হয়ে যাবে’
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Saturday, 6 April, 2019, 1:40 PM

‘একটা পায়ের দাম ৫০ লাখ টাকা দিলে তো বাজারে এর একটা দাম নির্ধারণ হয়ে যাবে’

‘একটা পায়ের দাম ৫০ লাখ টাকা দিলে তো বাজারে এর একটা দাম নির্ধারণ হয়ে যাবে’

‘এতো টাকার ক্ষতিপূরণ কেন দেব? আমি কী অপরাধ করেছি যে আমাকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে? কোর্ট বলেছে দেওয়ার জন্য, আমি তো বলিনি দেবো। এখন আমরা চিন্তা ভাবনা করছি কী করা যায়। এমন হলে বাংলাদেশে তো থাকতে পারবো না, পালিয়ে চলে যেতে হবে। একটা পায়ের দাম ৫০ লাখ টাকা দিলে তো বাজারে এর একটা দাম নির্ধারণ হয়ে যাবে। মানুষ পাঁচজন মারা গেলে কী হবে?

গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবহনটির জেনারেল ম্যানেজার আবদুস সাত্তার শুক্রবার (৫ এপ্রিল) এসব কথা বলেন।

এর আগে আদালতের আদেশ সত্ত্বেও গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারকে ক্ষতিপূরণের ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ না করায় গত বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) ক্ষোভ প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। ক্ষতিপূরণের এই টাকা আগামী ১০ এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এ সময় আদালত বলেন, ‘যত বড় বিজনেস ম্যান হোক না কেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যাননি। একটা সীমা থাকা দরকার। ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ না করলে প্রয়োজনে গ্রিন লাইন পরিবহনের সব গাড়ির চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। সব গাড়ি সিজ করে নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করে রাসেলকে টাকা দেওয়া হবে।’
গ্রিনলাইনের বাসচাপায় পা হারানো প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকার

রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুস সাত্তার বলেন, ‘কোর্ট খুব অ্যাগ্রেসিভ কথা বলেছেন। কোর্ট আমার সঙ্গে খুব কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন।  জাজমেন্ট দিয়েছেন ১০ তারিখে টাকা দেওয়ার জন্য। তা না করা হলে বলেছেন, গাড়ি চলা ও টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দেবেন, গাড়ি নিলামে তুলে দেবেন। আমাকে কোর্ট ভয় দেখিয়েছেন। এটাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।’

‘কোর্টের রায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। আমরা আমাদের বক্তব্যটা দিতে পারিনি। আমরা আপিল শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছি। আমরা বলতে চেয়েছি, আইন দেখাতে চেয়েছি। আইনেও তো কতকগুলো ধারা আছে। কোর্ট বলেছে, এটা আইনে হবে না, এটা দিতে হবে। আমাদের কোনও শুনানি তারা নেননি। আমরা রিভিউ আপিল করতে চেয়েছি, পারিনি। কারণ আমাদেরকে তো জাজমেন্ট উঠিয়ে নিয়ে রিভিউ আপিল করতে হবে। আমি জাজমেন্টের ফাইলও এখন পর্যন্ত পাইনি। আমাদের প্রোপ্রাইটর সাহেব ছিলেন না। তিনি অসুস্থতার কারণে দেশের বাইরে ছিলেন। তাকে বলেছি যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে আসার জন্য। তিনি আসলে আমরা এটা নিয়ে বসবো।’  বলেন আবদুস সাত্তার।

ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা পায়ের দাম ৫০ লাখ টাকা দিলে তো বাজারে এর একটা দাম নির্ধারণ হয়ে যাবে। মানুষ পাঁচজন মারা গেলে কী হবে? এখন রোড অ্যাক্সিডেন্ট তো সারা পৃথিবীতে হচ্ছে। আইনটাকে আরও কড়া করতে পারে। তাহলে চালক অ্যালার্ট হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘এখন বিষয়টি হচ্ছে, গ্রিন লাইন পরিবহন মালিককে তো অন্য মালিকরা এই টাকা দিতে দেবেন না। তাদের সঙ্গে তো মালিক সমিতি আছে। তারা বলছে, যদি আপনি দেন তবে আমরা যারা একটা-দুইটা গাড়ি চালাই আমাদেরও এই টাকা দিতে হবে। বিষয়টি এমন, আমরা এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করারও সুযোগ পাইনি। মার্চের ১৩ তারিখে রায় হয়েছে। সেই দিনেই বলে দিয়েছে ১৪ দিনের মধ্যে টাকা দিয়ে দেন। আমরা এটার জন্য বিরুদ্ধে ২৮ তারিখে আপিল করেছি। তারা ৩১ তারিখে আপিলের শুনানির তারিখ দিয়ে দিয়েছেন। টর্নেডোর গতিতে রায় দিয়ে দিয়েছেন।’

রায়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা একটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। বিষয়টা এমনও হতে পারে, আমরা টাকাও দিয়ে দিতে পারি। অথবা নতুন ইস্যু হয়ে মোটরযান আইনও পরিবর্তন হতে পারে। আমাদের দুটি সমিতি আছে। সমিতিতে শাহজাহান সাহেব, মশিউর রহমান রাঙ্গা ও ওসমান আলী সাহেব আছে। আমরা ৬৪ জেলার সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনাসহ অন্যান্য সবকিছু হচ্ছে। এখন দেখা যাক কী হয়। আমরা এখন মালিকদের অপেক্ষায় আছি। তারা আগামী রবি-সোমবার বসে একটা সিদ্ধান্ত দেবেন। এটা প্রোপার্টিশিপ, তাই আমরা তো আর তাদের বাইরে যেতে পারবো না। সমিতির বাইরে তো কিছু করা যাবে না।’

রায় প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কোর্টে আমাদের আইনজীবী বলেছেন,  “যে রায়টা দেওয়া হয়েছে সেটা কোন ধারাতে দেওয়া হয়েছে?” সেখানে জজ সাহেব বলেছেন, “এটাতে কোনও ধারা নেই।” গ্রিন লাইন পরিবহনকে ৫০ লাখ টাকা দিতে হবে। তারা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা দিলে খুব একটা আসবে যাবে না। আমরা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। তার মানে, তারাও আইনকে ভায়োলেট করে গেছে। এখন প্রধান বিচারপতি এভাবে বললে সেখানে শুনানি হয় না। এর আগেও স্বজন পরিবহনকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা দিতে বলা হয়েছে। সেটা আপিল বিভাগে স্থগিত হয়ে গেছে। এখন আমাদের উপরে শোয়ার হয়েছে। আসলে কপাল খারাপ থাকলে যা হয় আরকি।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণের বিষয়ে মোটর ভেহিকেল অর্ডিনেন্সে বলা আছে, কেউ যদি দুর্ঘটনায় মারা যায়, তাকে ২০ হাজার টাকা দিতে হবে। ওটাকে এক থেকে দুই লাখ টাকা করে দিক। পুলিশের কেউ মারা গেলে সেটা দুই লাখ টাকা দেওয়া হতো। এখন সেটাকে প্রধানমন্ত্রী ২০ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। রমিজ উদ্দিনের যে শিক্ষার্থী মারা গেছে তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী ২০ লাখ করে টাকা দিয়েছেন।’

রায়ের বিষয়ে রিভিউ আপিল করবেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কোর্টের রায়ের বিষয়ে রিভিউ আপিলের একটা সুযোগ আছে। আমরা চেষ্টা করছি। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি গতকাল লিভ টু আপিল করেছে। তারা মনে করছে, যে রায়টি হয়েছে সেটি শুধু গ্রিন লাইনের জন্য না। এটি সবার জন্য। যে কারণে তারা বলতে চাচ্ছে, আমাদের পূর্ণাঙ্গ শুনানি দরকার। কারণ শুনানি ছাড়া রায়টি হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনও চালক ইচ্ছা করে কাউকে গাড়ি চাপা দেয় না। আমরা ঘটনার পরে রাসেল সরকারের বাবা ও ভাই আরিফ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমরা প্রথমে তার চিকিৎসার অফার দিয়েছি। সে বলেছে তার চিকিৎসার দায়িত্ব একটি বিদেশি কোম্পানি নিয়েছে। এরপর আমরা তার জন্য পাঁচ লাখ টাকা অফার করেছি। এখন তারা বলছে আমরা তাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করিনি।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বলছি না দেবো না। এ বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত হবে। কোর্ট ১০ তারিখে পরিশোধ করতে বলেছে। তখন হয়তো আমাদের কিছু বলতে হবে।’

একটা পা কাটার জন্য যদি ৫০ লাখ টাকা দিতে হয় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা গাড়ির ব্যবসা করবো না। আমরা অন্য ব্যবসা করবো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে কথা কাটাকাটির জেরে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচালক ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাইভেটকারচালকের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেটকারচালক রাসেল সরকারের (২৩) বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পা হারানো রাসেল সরকারের বাবার নাম শফিকুল ইসলাম। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার জেলার পলাশবাড়িতে। ঢাকার আদাবর এলাকার সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় তার বাসা।

এ ঘটনায় সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম স্মৃতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। পরে আদালত রিটের শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন। গত ১২ মার্চ রাসেল সরকারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দেন। একইসঙ্গে রাসেলের চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় খরচ গ্রিন লাইন পরিবহন কর্তৃপক্ষকে বহন করতে এবং তার কৃত্রিম পা লাগানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। পরে এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ।

এরপর গত ৩১ মার্চ হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে গ্রিন লাইন পরিবহনের করা আবেদন খারিজ করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status