ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ২৬ জুলাই ২০২৬ ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
কারাগারেই স্টুডিও, বন্দিদের গান ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Sunday, 26 July, 2026, 4:17 PM

কারাগারেই স্টুডিও, বন্দিদের গান ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে

কারাগারেই স্টুডিও, বন্দিদের গান ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে

মধ্য আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুনের একটি কুখ্যাত কারাগারের নাম ‘নিউ বেল’। দেশটির বন্দরনগরী দুয়ালায় অবস্থিত এটি। বর্তমানে কারাগারটি যেন একটি শহরের ভেতরে আরেকটি শহর হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এখানকার বন্দিদের রয়েছে নিজস্ব বার্তাবাহক, নিজস্ব বাজার, এমনকি শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তাকারী বন্দিদের একটি দলও রয়েছে সেখানে। তবে এই কারাগারকে বিশ্বের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করেছে ভিন্ন একটি উদ্যোগ- কারাগারের ভেতরেই গড়ে ওঠা ‘জেইল টাইম রেকর্ডস’, একটি সংগীত স্টুডিও ও রেকর্ড লেবেল।

এই স্টুডিও শুধু গান রেকর্ড করে না; বরং অনেক বন্দির কাছে এটি আত্মপ্রকাশ, আত্মসমালোচনা এবং নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার একটি মাধ্যম।

কারাগারেই জন্ম তারকাদের
নিউ বেলের ভেতরে ধারণ করা একটি মিউজিক ভিডিও দিয়ে বন্দি গ্যাং নেতা এমপেরর ইউটিউবে প্রায় ২৪ হাজার দর্শক পেয়েছেন। কারাগারের শিল্পীদের গান পৌঁছে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

এ বছর কারাগারের ভেতরেই শত শত বন্দিকে নিয়ে বড় আয়োজনের একটি কনসার্টও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

জেইল টাইম রেকর্ডসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বন্দি স্টিভ হাপ্পি বলেন, “এটি আমাদের প্রতিরোধের একটি মাধ্যম। এখানে আমরা বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও নিজের কণ্ঠ প্রকাশ করতে পারি। তখন আর চার দেয়ালের কথা মনে থাকে না; আমরা যেন স্বাধীনতার অনুভূতি পাই।”

ছোট্ট স্টুডিও, বড় স্বপ্ন
স্টুডিওটি খুবই সাধারণ। একটি ছোট রেকর্ডিং বুথ, পাশে একটি কম্পিউটার রাখা কক্ষ- এই নিয়েই এর কার্যক্রম। কিন্তু এই ছোট্ট জায়গাটিই বহু বন্দির মানসিক মুক্তি ও সৃজনশীলতার আশ্রয় হয়ে উঠেছে।

স্টুডিওটির নামেই নির্মিত হয়েছে ‘জেইল টাইম রেকর্ডস’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র। স্টিভ হাপ্পি ও ইতালীয় শিল্পী ডিওনে রোচ ছয় বছর ধরে নিউ বেল কারাগারে চিত্রায়ণ করে এটি নির্মাণ করেন।

গত মাসে নিউইয়র্কের ট্রিবেকা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রামাণ্যচিত্রটি সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্রসহ তিনটি পুরস্কার জিতে নেয়।

গানেই বন্দিজীবনের আর্তনাদ
প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, স্টোন নামে এক বন্দি ‘হার্ট অব স্টোন’ শিরোনামের গানে নিজের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরছেন।

একসময় ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডে কর্মরত স্টোন ডাকাতি ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে ১০ বছরের সাজা ভোগ করছেন। যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

চলচ্চিত্রে বারবার দেখা যায়, তিনি নিজের ছোট মেয়ে মাইরার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই ব্যর্থ হচ্ছেন।

একটি ভয়েস মেসেজে তিনি বলেন, “অনেক দিন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে অন্তত আমার কণ্ঠটা যেন শুনতে পারে, যাতে বাবাকে ভুলে না যায়।”

অস্কারজয়ী নির্মাতার প্রশংসা
প্রামাণ্যচিত্রটির নির্বাহী প্রযোজকদের একজন নিউজিল্যান্ডের অস্কারজয়ী পরিচালক তাইকা ওয়াইতিতি।

তার ভাষায়, “এই সংগীত অসাধারণ। শিল্প মানুষের আত্মশুদ্ধি ও পুনর্বাসনের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। যারা হয়তো আজীবন কারাগারে থাকবে, তাদের জন্য এমন একটি সৃজনশীল আশ্রয় অত্যন্ত মানবিক উদ্যোগ।”

কীভাবে শুরু হয়েছিল উদ্যোগটি?
২০১৮ সালে ইতালীয় শিল্পী ডিওনে রোচ একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিউ বেল কারাগারে কাজ শুরু করেন।

একটি নৃত্য কর্মশালায় কয়েকজন বন্দি হঠাৎ র‌্যাপ পরিবেশন করলে তিনি মুগ্ধ হন। এরপর কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্টুডিও স্থাপন করেন এবং স্টিভ হাপ্পিকে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযোজক হিসেবে যুক্ত করেন।

হাপ্পির দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে নিজের বাবাকে হত্যার অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে আদালতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।

আয়ের ভাগ পান শিল্পীরাই
২০২২ সালে জেইল টাইম রেকর্ডস ‘জেইল টাইম ভলিউম–১’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে।

এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী, অ্যালবাম বিক্রির আয়ের অর্ধেক শিল্পীদের দেওয়া হয় এবং বাকি অর্থ আবার স্টুডিও পরিচালনায় বিনিয়োগ করা হয়।

ভয়াবহ বাস্তবতার মাঝেও আশার আলো
নিউ বেল কারাগারের বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বন্দি সেখানে অবস্থান করছিলেন, যা কারাগারটির ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কয়েক বছর আগে কলেরার প্রাদুর্ভাবে অন্তত ছয় বন্দির মৃত্যু হয়। ২০০৮ সালে কারাগার ভাঙার চেষ্টার সময় নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন ১৬ বন্দি।

কারাগারের ভেতরে বন্দিদের মধ্যে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও প্রায়ই ঘটে।

অপরাধের মহিমা নয়, পুনর্বাসনের চেষ্টা
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ভয়ংকর অপরাধীদের নিয়ে গান তৈরি করে তাদের কি গৌরবান্বিত করা হচ্ছে?

এর জবাবে ডিওনে রোচ বলেন, “এটি মূলত পুনর্বাসনের একটি প্রক্রিয়া। আমরা কোনও ভাবনাচিন্তা না করেই কারাগারে প্রবেশ করি। সংগীত মানুষের আত্মঅনুসন্ধান, নিজের ভুলের মুখোমুখি হওয়া এবং পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে।”

কারা কর্তৃপক্ষও এই উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছে। এ বছরের কনসার্টে কারাগারের প্রধান নিজেও উপস্থিত ছিলেন এবং শিল্পীদের সঙ্গে নাচে অংশ নেন।

নারী বন্দিদের জন্যও সুযোগ
জেইল টাইম রেকর্ডস এখন শুধু পুরুষ বন্দিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কারাগারের নারী শাখার বন্দিরাও এতে অংশ নিচ্ছেন। তাদের প্রথম শিল্পী জেজে, যিনি ২০২২ সালে ‘শো মি দ্য ওয়ে’ শিরোনামের আফ্রোবিটস গান প্রকাশ করেন।

এছাড়া এই উদ্যোগ এখন ক্যামেরুনের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগুর কেন্দ্রীয় কারাগারেও একই ধরনের একটি স্টুডিও চালু করা হয়েছে।

প্রামাণ্যচিত্রটির শেষ দৃশ্যে প্রকল্প চলাকালে মারা যাওয়া ছয় বন্দির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।

স্টিভ হাপ্পির বিশ্বাস, নিউ বেলের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও সংগীত বন্দিদের জন্য নতুন ভবিষ্যতের আলোর প্রদীপ।

তার ভাষায়, “আগে তারা ভাবত, পুরো পৃথিবীই তাদের বিরুদ্ধে। এখন তারা মনে করে, সমাজে তাদেরও একটি জায়গা আছে এবং তারাও গুরুত্বপূর্ণ।” সূত্র: বিবিসি

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status