|
ভারত ভ্রমণ শেষে মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী নিয়ে ফিরলেন নারী!
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ভারত ভ্রমণ শেষে মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী নিয়ে ফিরলেন নারী! কিন্তু কে জানত, এই সাবধানতাই তার জীবনে এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে! অজান্তেই তিনি এমন খাবার খেয়ে ফেলেছিলেন, যা শুকরের ফিতাকৃমির আণুবীক্ষণিক ডিমে সংক্রমিত ছিল। ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরার ৩ বছর পর, অর্থাৎ ২০১০ সালে লোরি প্রথম বুঝতে পারেন তার শরীরে কিছু একটা সমস্যা রয়েছে। একদিন রেস্তোরাঁর টয়লেটে গিয়ে তিনি নিজের শরীর থেকে প্রায় এক মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি বের হতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও প্রাথমিক মল পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি এবং তিনি সুস্থ বোধ করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই নেন। এর ঠিক এক বছর পর থেকে শুরু হয় লোরির আসল নরকযন্ত্রণা। তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি ২০১১ সালে তিনি প্রথমবার মারাত্মক খিঁচুনি বা মৃগীরোগের আক্রমণের শিকার হন। হাসপাতালে ভর্তির পর সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই পরীক্ষার রিপোর্টে চিকিৎসকেরা যা দেখলেন, তাতে সবার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। লোরির মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে অন্তত ৩৮টি পরজীবী! পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে লোরি নিউরোসিস্টাইসারকোসিস নামের একটি বিরল মস্তিস্কের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, সাধারণত কাঁচা বা আধসেদ্ধ শুকরের মাংস, পরজীবীর ডিম দ্বারা দূষিত পানি পান বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। যুক্তরাজ্যে এই রোগটি এতটাই বিরল যে, সাধারণত আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের ছাড়া স্থানীয়দের মাঝে এটি দেখাই যায় না। পরজীবী মারার ওষুধ ও স্টেরয়েড চিকিৎসার পর লোরি সাময়িকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কয়েক বছর বেশ ভালোই কাটছিল তার—বোনকে নিয়ে নিউজিল্যান্ড ভ্রমণ, ব্রিস্টলে স্থানান্তর, সার্কাস ক্লাস করা এবং হাফ-ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু বিপর্যয় আবার হানা দেয়। কর্মক্ষেত্রে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান তিনি। স্ক্যান করে দেখা যায়, মস্তিষ্কের পরজীবীগুলোর চারপাশে প্রচণ্ড ফোলা ভাব তৈরি হয়েছে। এর পর থেকেই লোরির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। স্টেরয়েডের প্রভাবে তার বাহ্যিক চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং তীব্র বিষণ্নতা, প্যারানয়া ও সাইকোসিসের মতো গুরুতর মানসিক রোগ দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তাকে টানা ছয় সপ্তাহ নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাটাতে হয়। লোরির দীর্ঘ ২০ বছরের পুরোনো বান্ধবী নিকোলা ব্রাউন সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, হাসপাতালে লোরি পুরোপুরি একটি শিশুর মতো আচরণ করছিল। মেঝেতে হামাগুড়ি দেওয়া, পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা—ওকে চেনা যাচ্ছিল না। তবে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর লোরি আবার তার সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নেন। ২০১৮ সালে ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে ডিগ্রি নেন এবং ২০২২ সালে পুরোদমে কাজে ফেরেন। লোরির চিকিৎসক এবং সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. ব্রেন্ডন হিলি জানান, আমার পুরো কর্মজীবনে এটিই একমাত্র এবং সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা। যুক্তরাজ্যের এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা লোরির এই কেসটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এটি এতটাই বিরল যে, দেশের অনেক সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ তাদের পুরো জীবনেও এমন একটি রোগী দেখার সুযোগ পাবেন না। বর্তমানে লোরির মস্তিষ্কের সেই ৩৮টি পরজীবী চিকিৎসার মাধ্যমে মারা গেছে এবং সেগুলো এখন ক্যালসিফাইড (নিষ্ক্রিয় পাথরের মতো) অবস্থায় রয়েছে। ২০১৭ সালের পর তার আর কোনো খিঁচুনি হয়নি, তবে সতর্কতাস্বরূপ জীবনের বাকিটা সময় তাকে মৃগীরোগের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। ৪২ বছর বয়সি লোরি বর্তমানে কার্ডিফে বসবাস করছেন। নিজের এই ভয়ানক অভিজ্ঞতাকে পেছনে ফেলে তিনি এখন মানুষের মাঝে এই বিরল রোগটি নিয়ে সচেতনতা ছড়াতে চান। লোরি বলেন, আমি আবার বেঁচে আছি, সুস্থ আছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। জীবনকে এখন আমি প্রতি মুহূর্তে উপভোগ করি। সূত্র: বিবিসি। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
