ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ১৪ জুন ২০২৬ ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শাপলা ট্র্যাজেডি থেকে পরীমণি: গত এক দশকে সমালোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন বেনজীর
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Sunday, 14 June, 2026, 8:36 PM

শাপলা ট্র্যাজেডি থেকে পরীমণি: গত এক দশকে সমালোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন বেনজীর

শাপলা ট্র্যাজেডি থেকে পরীমণি: গত এক দশকে সমালোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন বেনজীর

একসময় দেশের গোটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়, যাঁর একটি ইশারায় কাঁপত অপরাধজগৎ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ময়দান। তিনি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, র‍্যাবের মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ আইজিপি—পুলিশের এই শীর্ষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যেমন ছিলেন অসীম ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক, তেমনই জড়িয়েছেন নানা রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনায়। তবে চাকরিজীবন শেষে এবার দুর্নীতির এক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে নতুন করে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছেন এই সাবেক পুলিশপ্রধান।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিবিড় অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের নামে-বেনামে গড়ে তোলা পাহাড়সম সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসার পর আদালত একের পর এক সম্পত্তি ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজের নির্দেশ দিয়েছেন। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানের ৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, শত শত বিঘা জমি, বিভিন্ন নামী কোম্পানির শেয়ার এবং কোটি কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র।

পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন বেনজীর আহমেদ। পেশাগত জীবনে ধাপে ধাপে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসলেও তিনি প্রথম জাতীয়ভাবে লাইমলাইটে আসেন ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব পাওয়ার পর।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি ঢাকার পুলিশপ্রধানের দায়িত্ব সামলান। এরপর ২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তাঁকে র‍্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে টানা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় কমান্ড ধরে রাখার পর, ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল দেশের ৩০তম আইজিপি হিসেবে ট্র্যাডিশনাল ব্যাটন বুঝে নেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরে যান।

অনেক ভূরাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো পুলিশ প্রধান এতটা প্রকাশ্যে প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিকভাবে আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন না।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াাত হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বেনজীর আহমেদকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছিলেন:

আমার মতে দেশের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে দৃশ্যমান আইজিপি। তিনি যে ক্ষমতাধর, সেটি বোঝাতে কখনো কার্পণ্য করেননি।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেকোনো বড় ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেনজীর আহমেদ ছিলেন অন্যতম প্রধান মুখ। ২০২০ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর দেওয়া একটি বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোড়ন তুলেছিল, যেখানে তিনি বলেছিলেন, “স্বাধীনতা, সংবিধান, রাষ্ট্র ও জাতির জনক কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

তাঁর এমন মন্তব্যকে অনেকেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক দর্শনের সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে দেখতেন।

২০১৩ সালে রাজধানী ঢাকাকে অচল করে দেওয়া হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশ উচ্ছেদ অভিযানে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে সম্মুখ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বেনজীর। পরবর্তীতে অপারেশন সিকিউর শাপলা নামে পরিচিত সেই অভিযানে কোনো ধরনের প্রাণঘাতী বা মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি বলে তিনি বরাবরই দাবি করে আসছিলেন, যদিও ওই রাতের ঘটনাটি নিয়ে দেশ-বিদেশে এখনো বিতর্ক রয়ে গেছে।

এ ছাড়া ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির আন্দোলন কঠোর হস্তে দমনে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের চারপাশ বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাটি তখন বৈশ্বিক রাজনীতিতেও শোরগোল ফেলেছিল। সেই সময় ঢাকার পুলিশপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এই বেনজীর আহমেদ।

পরবর্তীতে র‍্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ‘ক্রসফায়ার’-এর অভিযোগ বারবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো উথাপন করেছে। তবে তিনি সবসময়ই এসব অভিযোগকে সাজানো বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং উল্টো অপরাধ দমনে বাহিনীর কঠোর অবস্থানের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন।

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার র‍্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর গুরুতোর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা (স্যাংকশন) জারি করলে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন বেনজীর। এর ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা দেশের প্রথম আইজিপি হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয়।

পেশাগত উর্দির বাইরেও ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায়ই সংবাদ শিরোনাম হতেন বেনজীর আহমেদ। ২০২১ সালে ঢালিউড চিত্রনায়িকা পরীমণিকে কেন্দ্র করে ঢাকার অদূরে সাভারের বোট ক্লাবে ঘটে যাওয়া একটি স্ক্যান্ডালে নতুন করে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে।

সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর দেশবাসী জানতে পারে যে, তিনি ওই অভিজাত বাণিজ্যিক ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। একজন দায়িত্বরত আইজিপি কীভাবে এমন একটি বিলাসবহুল বাণিজ্যিক ক্লাবের প্রধান পদে থাকতে পারেন এবং এই ক্লাবের পেছনে তাঁর বিপুল আর্থিক উৎসের জোগান কোথা থেকে এলো—এসব তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তখন জাতীয় সংসদ ভবন পর্যন্ত গড়িয়েছিল। 

দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একদম কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি অবস্থান করায় এবং সরকারের অন্ধ আনুগত্য পাওয়ায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো অভিযোগই তখন ডালপালা মেলতে পারেনি বা প্রশাসন আমলেই নেয়নি। তবে অবসরে যাওয়ার পর হঠাৎ তাঁর এই গগনচুম্বী দুর্নীতির খতিয়ান ও অবৈধ সম্পদের বিবরণ জনসমক্ষে আসায় তাঁর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।

অবশ্য নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত অভিযোগ শুরু থেকেই জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছেন সাবেক এই আইজিপি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির প্রতিটি অভিযোগই সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অবসরের পর একটি বিশেষ মহল তাঁকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

তবে দুদকের গভীর অনুসন্ধান আর আদালতের একের পর এক সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশের পর দেশের আমজনতা থেকে শুরু করে সচেতন মহলে এখন একটাই বড় কৌতূহল—দেশের ইতিহাসের অন্যতম ক্ষমতাধর এই পুলিশকর্তার এই দুর্নীতির মামলার শেষ পরিণতি আসলে কোথায় গিয়ে ঠেকে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status