|
এত তেল যাচ্ছে কোথায়
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() এত তেল যাচ্ছে কোথায় তাহলে এত জ্বালানি যাচ্ছে কোথায়! এদিকে প্রায় দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানিসংকটের প্রভাবে জনভোগান্তি চরমে। দেশের অনেক এলাকায় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলও এতে বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারির কারণে নগরজুড়ে যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট শুধু সরবরাহ ঘাটতির নয়; বরং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা, কালোবাজারি, অব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও সমন্বয় করা না গেলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে জানান, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। পাম্পগুলোতে মূলত অকটেন নিতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভিড় করছে। পেট্রল পাম্প থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসছে। কিন্তু গত বছর একই সময়ে তারা যতটুকু তেল নিয়েছে, এবারও তা দেওয়া হচ্ছে। এতে কোনো কোনো পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল রবিবার থেকে অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর চিন্তা করছে বিপিসি। সরেজমিনে দেখা গেছে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ এলাকার পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাম্প পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও বা সীমিত পরিসরে বিক্রি চলছে। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। দেশের বিভাগগুলো থেকে গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরে ৬২টি পেট্রল পাম্পের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বন্ধ রয়েছে। পাম্প মালিকরা জানান, সপ্তাহে মাত্র এক দিন জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। সেই তেলও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সিলেট বিভাগে নতুন রেশনিং নীতির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি। এ কারণে প্রায় ৮০ থেকে ৯০টি পাম্প তেল বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। রাজশাহীতেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। পাম্প মালিকরা জানান, আগের বছরের তুলনায় বেশি জ্বালানি সরবরাহ পেলেও চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক দিন বিক্রি করে কয়েক দিন পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বরিশাল বিভাগে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ৫৭টি ফিলিং স্টেশনের অনেকগুলোতেই সপ্তাহের প্রায় অর্ধেক সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ময়মনসিংহে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। আগে যেখানে এক সপ্তাহের জ্বালানি বিক্রি হতো, এখন তা পাঁচ-সাত ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাম্পে তেল পাওয়ার খবরে ভোর থেকেই চালকদের ভিড় বাড়ছে। কোথাও কোথাও তেল না পেয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। খুলনায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম সরবরাহ থাকায় পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও ভিড় তৈরি হচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকদের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ প্রবণতা সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে রংপুরের চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এখানে প্রকৃত সংকটের চেয়ে আতঙ্ক, কালোবাজারি ও অবৈধ মজুদের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (একাংশ) সভাপতি নাজমুল হক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তেলসংকট ঢাকার বাইরেই বেশি। ঢাকার মধ্যেও পাম্প বন্ধ থাকছে। ঢাকার বাইরের অনেক পাম্পে ১৫ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৪০ শতাংশ পাম্পে মাসে ১৫-২০ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতেও ৬০ শতাংশ পাম্প তেল দিচ্ছে, তাও গত বছর যা দিয়েছে সেই হারে দিচ্ছে। গত বছরের গাড়ির সংখ্যা আর এই বছরের গাড়ির সংখ্যা তো এক নয়।’ বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আরেকাংশ) সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দীন পারভেজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশে দুই হাজার ২৯৮টি পেট্রল পাম্প রয়েছে। তেলের সংকটের মূল কারণ সরবরাহ বন্ধ নয়; বরং চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। সরকার তেল দিচ্ছে, এটা আমরা অস্বীকার করছি না। সমস্যা হচ্ছে, বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক পাম্প মাসের শুরুতেই তাদের বরাদ্দ তেল শেষ করে ফেলছে। ফলে মাসের বাকি সময় পাম্পে তেল থাকে না, যার কারণে বন্ধ রাখতে হয়। এটা এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে গেছে, যেন মরুভূমিতে এক বালতি পানি ঢালা, দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ।’ এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি মজুদ রয়েছে। সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং বর্তমানে কোনো ঘাটতির আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, ‘এপ্রিল ও মে মাসের জন্য দেশে প্রয়োজনীয় জ্বালানির পূর্ণ মজুদ রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী জুন মাসের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’ গতকাল শুক্রবার চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুদ রয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৮৫ টন, অকটেন ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রল ১৮ হাজার ২১ টন এবং ফার্নেস ওয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন। বিপিসির তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় এবার এপ্রিলে অকটেনের সরবরাহ কমেছে ৪৯ টন। আর মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিলে সরবরাহ কমেছে ১০৪ টন। গত বুধবার পর্যন্ত দৈনিক ডিপো থেকে গড়ে সরবরাহ হয়েছে এক হাজার ১১৫ টন অকটেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় হয়তো সরবরাহ পর্যাপ্ত বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে আতঙ্ক কমাতে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তেল বিক্রির সীমা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে নগরের বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ লাইনের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে শঙ্কায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তেল মজুদ করছে। সরকার এরই মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা, জেলসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। এরই মধ্যে অভিযান চালিয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধারও করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরে ৪০ শতাংশ পাম্প বন্ধ : চট্টগ্রাম মহানগরীতে মোট ৬২টি পেট্রল পাম্পের মধ্যে বর্তমানে ৪০ শতাংশ বা ২৪টির বেশি পাম্প পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে খোলা থাকা পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রল পাম্প আছে ৩৮৩টি। পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এহেসানুর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরে রয়েছে ৬২টির মতো পাম্প। নগরীতে বর্তমানে ৪০ শতাংশ পাম্প সপ্তাহে মাত্র এক দিন তেল পাচ্ছে। বিশেষ করে অলিগলির পাম্পগুলো আগে থেকেই সপ্তাহে এক দিন তেল পেত, যা বর্তমানেও বিদ্যমান। কিন্তু তেলের তীব্র সংকট ও উচ্চ চাহিদার কারণে সরবরাহ পাওয়ার তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পাম্পগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’ অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সাধারণ সম্পাদক মাঈনুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘তেলের ঘাটতি আছে। তবে মানুষ আতঙ্কিত হয়েও বেশি তেল নিচ্ছে। এতেই সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।’ গতকাল নগরীর চান্দগাঁও, বহদ্দারহাট এবং নতুন ব্রিজ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তীব্র হাহাকার। শামন্তা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যমুনা অয়েল কম্পানি থেকে আগে মাসে আটটি ট্যাংকার পেলেও বর্তমানে সপ্তাহে মিলছে মাত্র একটি। সিলেটে অর্ধশতাধিক পাম্পে তেল বিক্রি বাধাগ্রস্ত : সিলেট বিভাগে ১১৯টির মতো ছোট-বড় পাম্প রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৯০টির মতো ছোট আকারের পাম্প তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে। পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সিলেটের নেতারা বলছেন, আমরা জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিতভাবে বিষয়টি অবগত করেছি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও বিষয়টি অবগত করেছি। দ্রুত এটি সমাধান করা না গেলে সংকট ও জ্বালানি নিয়ে বিশৃঙ্খলা বাড়বে। জানা গেছে, এত দিন সিলেটের ফিলিং স্টেশনগুলোতে কোটা পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হতো। জ্বালানি তেল পাচার ও অবৈধ মজুদ বন্ধে এমন পদ্ধতি চালু করা হয়। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদেরও আপত্তি ছিল না। কিন্তু গত ১৩ এপ্রিল বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়, তেল সরবরাহকালে প্রতিটি ফিলিং স্টেশনকে প্রাপ্যতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ দুই দিনের সমপরিমাণ তেল সরবরাহ করতে পারবে। এই নির্দেশনার ফলে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগের মুখপাত্র ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম হক আদনান বলেন, ‘এত দিন গত বছরের বিক্রির সঙ্গে তুলনা করে সে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল। যেহেতু পাচার রোধ ও অবৈধ মজুদ বন্ধে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আমরা সেটা মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলাম। আমাদের পদক্ষেপের কারণে সিলেটে তেল বিক্রি নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা বা সমস্যা হয়নি। কিন্তু এখন নতুন নির্দেশনা পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।’ ময়মনসিংহে সাত দিনের তেল বিক্রি হচ্ছে ৬ ঘণ্টায় : বাড়তির চাহিদার কারণে ময়মনসিংহের পেট্রল পাম্পগুলোতে আগে যে পরিমাণ তেল সাত দিনে বিক্রি হতো, সেটা এখন মাত্র ৬ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে পেট্রল পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন। পাম্প মালিকরা জানান, মোটরসাইকেল চালকদের চাহিদা কমছে না। পাম্পে তেল দেওয়ার খবর আগে থেকে জেনে ভোর থেকে অপেক্ষা করে চালকরা। পাম্পের তেলের মজুদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভিড় লেগেই থাকে। ময়মনসিংহ ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ময়মনসিংহের ত্রিশালে আমার পাম্পে বৃহস্পতিবার সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন পেয়েছি। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিক্রি শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে শেষ। অথচ আগে সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হতো এক সপ্তাহে। পাম্পের কর্মচারীরা জানান, কিছু পরিচিত গ্রাহক, যারা আগে ১০০ থেকে ২০০ টাকার তেল নিত, তাদের এখন দেখি ৫০০ টাকা করে নেয়। এত অকটেন কোথায় যায়? মনে হচ্ছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মজুদদারি হচ্ছে।’ রাজশাহীতে বন্ধ থাকছে বেশির ভাগ পাম্প : রাজশাহীতে মোট ৪৪টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে বেশির ভাগ স্টেশনই সাময়িকভাবে বন্ধ থাকছে। যেসব স্টেশন খোলা থাকছে, সেগুলোতেও এক দিনেই তেল বিক্রি করা হয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর আব্দুস সালাম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার রোকনুজ্জামান জানান, গত ১৩ এপ্রিল তাঁদের পাম্পে সাড়ে চার হাজার লিটার পেট্রল এবং সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই দিন তাঁরা সেগুলো বিক্রি করেন। কিন্তু সকাল থেকে বিকেলের মধ্যেই সব তেল শেষ হয়ে যায়। তার পরও লাইন শেষ হয়নি মোটরসাইকেলের। রাজশাহী পেট্রল পাম্প ট্রাক লরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, এত তেল যাচ্ছে কোথায়? আমরা তো আগের চেয়ে বেশি তেল বিক্রি করছি। কিন্তু তেল আনতে না আনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে এক দিন তেল বিক্রি করলে বাকি তিন দিনই পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন গড়ে রাজশাহীতে অন্তত ৩০টি পাম বন্ধ থাকছে। রংপুরে সংকটে আতঙ্ক, কালোবাজারি : রংপুর বিভাগে তীব্র জ্বালানিসংকটের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা বাস্তবে কতটা সত্য এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বলছে, সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি না থাকলেও আতঙ্ক, কালোবাজারি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় কালোবাজারি রোধে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে ভিজিলেন্স টিম গঠন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার পরামর্শ এসেছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, এই পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা ও কালোবাজারি। তাদের দাবি, একটি চক্র একই মোটরসাইকেল বা অন্য বাহনে করে একাধিক পাম্প থেকে অতিরিক্ত পেট্রল ও অকটেন ও জ্বালানি সংগ্রহ করছে। পরে সেই জ্বালানি কালোবাজারে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। রংপুর বিভাগ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৩৮০টি পেট্রল পাম্প রয়েছে। সেসব পাম্প গত বছর যে পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করে বিক্রি করেছে, এবারও সেই চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত জ্বালানি পাচ্ছে। তবে যেসব পাম্পে বরাদ্দ কম বা সরবরাহ অনিয়মিত, সেগুলোয় চাহিদা থাকায় দ্রুত বিক্রি শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী বরাদ্দ না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বরিশালে অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ থাকছে পাম্প : বরিশালের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন পরিবহনচালক থেকে সাধারণ মানুষ। বরিশাল বিভাগীয় পেট্রল পাম্প ও ট্যাংকলরি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, ‘বিভাগের আওতায় থাকা ৫৭টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে বেশির ভাগ স্টেশনেই এখন জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু মজুদপ্রবণতার কারণে সেই জ্বালানি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ বরিশাল নগরের মেসার্স কলেজ রোড ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পেট্রল, অকটেন কিংবা ডিজেল কোনোটিই নেই। স্টেশনটির ব্যবস্থাপক শাহীন হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর থেকেই তাঁদের সরবরাহ বন্ধ। তিন দিন পরপর তিন থেকে পাঁচ হাজার লিটার জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। খুলনায় পাম্পে ভিড় বাড়ছেই : চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় খুলনায় জ্বালানি তেল কিনতে পাম্পে পাম্পে ভিড় বাড়ছে। গতকালও মহানগরীসহ জেলার পাম্প স্টেশনগুলোয় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের তেল সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। পাম্প মালিকরা বলছেন, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় দ্রুত পাম্পের তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। আবার মোটরবাইক চালকরা প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করছে। ফলে ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীসহ জেলায় ২৯টি তেল পাম্প সচল রয়েছে। এসব পাম্পে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সরকার ২০ শতাংশ কম জ্বালানি সরবরাহ করছে। প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন—আবু তৈয়ব (চট্টগ্রাম), রফিকুল ইসলাম (রাজশাহী), কামরান পারভেজ (ময়মনসিংহ), রফিকুল ইসলাম রফিক (রংপুর), রফিকুল ইসলাম (বরিশাল), ইয়াহইয়া ফজল (সিলেট) ও কৌশিক দে (খুলনা)। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
