৫৬ বছর পর ভোটকেন্দ্রে এলেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা। স্থানীয়ভাবে এই নারীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এই ইউনিয়নের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে নারীদের উপচে পড়া ভিড়। স্থানীয়দের মধ্যে এ নিয়ে চলছে আলোচনা। তাঁরা উচ্ছ্বসিত।
আয়েশা বেগমের বয়স ৭০ বছর। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে। এসেছেন ভোট দিতে। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম ভোট দিতে এসেছেন। খুবই ভালো লাগছে।’
এত বছর কেন ভোট দেননি জানতে চাইলে আয়েশা বেগম বলেন, ‘নিষেধ ছিল। স্থানীয় লোকজন আমাদের বোঝানোর পর ভোট দিতে এসেছি।’
রূপসা ইউনিয়নের বাসিন্দা নূরজাহান বেগম বলছিলেন, তাঁর বিয়ে হয়েছে ৪৫ বছর। এ সময় তিনি কোনো ভোট দেননি। তাহলে এখন কেন ভোট দিতে এসেছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই বলছে, তোমরা নারীরা বাজারে যাও, চাকরি কর, সবকিছুই কর তাহলে ভোট দিতে পারবা না কেন? ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়া হারাম নয়। তাহলে ভোট দিতে সমস্যা কোথায়। এখন আমাদের মধ্যেই উপলব্ধি এসেছে, এত দিন ভোট না দিয়ে আসলে ভুল করেছি। তাই ভোট দিতে এসেছি।’
সরেজমিন দেখা যায়, গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপচে পড়া ভিড়। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এ কে এম লোকমান হাকিম প্রথম আলোকে বলেন, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ৬০৩। এর মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৮১১ ও নারী ১ হাজার ৭৯২। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৪০১ জনের। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৫৯ জন।
এই ইউনিয়নে মোট ভোটার ২১ হাজার ৬৯৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ১০ হাজার ২৯৯ জন। তাঁদের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
‘দেশের নেতা নির্বাচনে আমার সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ’ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১৯৬৯ সালে স্থানীয়ভাবে নারীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে বিভিন্ন সময়ে নারীদের ভোটকেন্দ্রে আসার জন্য উৎসাহ দিলেও এত বছর তাঁরা আসেননি।
সম্প্রতি চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার স্থানীয় ইমামসহ নারীদের নিয়ে বৈঠক হয়। সেসব বৈঠকে নারীদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হয়। স্থানীয় প্রশাসন এই ইউনিয়নের আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও সাধারণ মানুষদের নিয়ে বৈঠক করে।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের ভোট দেওয়া কোনো অপরাধ নয়। ৫৬ বছর বছর আগে স্থানীয় পর্যায়ে সাময়িক নির্দেশনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য নয়।
চরমান্দারী শহীদ স্মৃতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও দেখা যায় নারীদের উপস্থিতি। সেখানে কথা হয় অর্চনা রানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এর আগে তিনি কখনো ভোট দেননি। এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে এসেছেন।’
তবে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আবদুস সামাদ বলেন, এর আগে কখনো ভোট না দেওয়ায় কীভাবে ভোট দিতে হয় এ প্রক্রিয়া সম্পর্কে নারীরা কিছু জানে না। অনেকে আমার কাছে জানতে চায় কীভাবে ভোট দেবে, লাইনে দাঁড়াতে হয় এটাও অনেকে জানে না। ‘এটিই হয়তো আমার দেওয়া শেষ ভোট’
এই ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৬১৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ হাজার ২৭০ জন। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মোট ভোট পড়েছে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি। এই কেন্দ্রেও নারীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
বেলা ১১টার দিকে গৃদকালিন্দিয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে আসেন পুলিশ সুপার (এসপি) রবিউল হাসান। তিনি বলেন, নারীদের বোঝানো হয়েছে ভোটকেন্দ্রে আসলেও পর্দার সমস্যা হবে না। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে। জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি।